- সময় টেলিভিশনের কার্যালয়ে একাডেমিক সফরে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ।
টেলিভিশনের পর্দায় যে সংবাদ আমরা প্রতিদিন দেখি, সেই কয়েক মিনিটের সংবাদের পেছনে লুকিয়ে থাকে শত শত মানুষের নিরলস পরিশ্রম, ক্যামেরার ক্লিকে ধরা পড়া অসংখ্য মুহূর্ত, আর কন্ট্রোল রুমের ঝলমলে পর্দায় ফুটে ওঠা প্রতিটি ফ্রেমের নিখুঁত সমন্বয়। এই অদৃশ্য জগৎটিকে কাছ থেকে দেখার, ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেলেন চট্টগ্রামের একদল তরুণ স্বপ্নবাজ—যাঁদের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে কলম, ক্যামেরা আর মাইক্রোফোনের সঙ্গে।
গত বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পা রাখলেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘সময় টেলিভিশন’-এর কার্যালয়ে। বিভাগের চেয়ারম্যান ইয়াসির সিলমী এবং প্রভাষক সরওয়ার কামালের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই একাডেমিক ভিজিট ছিল ‘ডেপথ রিপোর্টিং’ এবং ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড প্রেজেন্টেশন স্কিল’ কোর্সের একটি বাস্তবমুখী অধ্যায়—যেখানে পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব রূপ নিল জীবন্ত অভিজ্ঞতায়।
সময় টেলিভিশনের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা ভেতরে পা রাখলেন, তখন তাঁদের সামনে উন্মোচিত হলো এক অজানা জগৎ। এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার রাফিউল ইসলাম, হেড অব নিউজ মুজতবা খন্দকার এবং রিপোর্টার কামরুল হাসানের আন্তরিক অভ্যর্থনায় শুরু হলো এক অনন্য যাত্রা।
প্রথমে বার্তা কক্ষ। সারিবদ্ধ কম্পিউটারে চোখ রেখে বসে আছেন সংবাদকর্মীরা, কেউ তথ্য যাচাই করছেন, কেউ লিখছেন আগামী বুলেটিনের স্ক্রিপ্ট, কেউবা ফোনে কথা বলছেন মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদকের সঙ্গে। সংবাদের এই কর্মযজ্ঞ দেখে শিক্ষার্থীরা যেন মুগ্ধ। তাঁরা বুঝতে পারলেন, একটি সংবাদ পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আগে কতগুলো হাত, কতগুলো চোখ আর কতগুলো মন একসঙ্গে কাজ করে।
এরপর স্টুডিও। ক্যামেরার চোখের সামনে দাঁড়ালে সংবাদ পাঠকের যে আত্মবিশ্বাস, তার পেছনে রয়েছে আলোর সূক্ষ্ম বিন্যাস, শব্দের নিখুঁত মাত্রা, আর ব্যাকড্রপের প্রতিটি রঙের পরিকল্পিত নির্বাচন। প্রোডাকশন কন্ট্রোল রুম (পিসিআর)-এ ঢুকে শিক্ষার্থীরা দেখলেন এক বিস্ময়কর দৃশ্য—শতাধিক বোতাম, সারি সারি মনিটর, আর প্রতিটি পর্দায় ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেম। এক চাপে দৃশ্য বদলায়, আরেক চাপে যুক্ত হয় গ্রাফিক্স, তৃতীয় চাপে শোনা যায় প্রতিবেদকের কণ্ঠ। এ যেন এক জীবন্ত অর্কেস্ট্রা, যেখানে কন্ডাক্টরের ভূমিকায় থাকেন প্রোডিউসার।
মাস্টার কন্ট্রোল রুম (এমসিআর)-এ গিয়ে শিক্ষার্থীরা জানলেন, কীভাবে সম্প্রচারের সিগন্যাল লক্ষ লক্ষ দর্শকের ঘরে পৌঁছায়। এডিটিং প্যানেল রুমে দেখলেন, কাঁচা ফুটেজ থেকে কীভাবে তৈরি হয় একটি পরিপাটি প্রতিবেদন—কোথায় কাট পড়ে, কোথায় যুক্ত হয় ভয়েস-ওভার, কোথায় বসে গ্রাফিক্স। অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া বিভাগে গিয়ে তাঁরা বুঝলেন, ডিজিটাল যুগে সংবাদ শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়—এ ছড়িয়ে যায় ফেসবুক, ইউটিউব, ওয়েবসাইট হয়ে কোটি মানুষের হাতের মুঠোয়।
এরপর শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসু চোখে যেন ঝরে পড়ছিল কৌতূহল। প্রতিবেদক কামরুল হাসান তুলে ধরলেন মাঠ পর্যায়ের কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা—কখনো প্রবল বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে লাইভ রিপোর্টিং, কখনো ভিড় ঠেলে সংবাদের উৎসের কাছে পৌঁছানোর সংগ্রাম, কখনো সময়ের সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে ব্রেকিং নিউজ পাঠানোর তাড়া। সংবাদ সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নিয়ে তাঁর প্রতিটি কথা যেন একেকটি জীবন্ত পাঠ।
প্রোডিউসাররাও পিছিয়ে রইলেন না। তাঁরা শিক্ষার্থীদের সামনে উন্মোচন করলেন সংবাদ প্রস্তুত ও সম্প্রচারের নেপথ্যের সেই খুঁটিনাটি, যা সাধারণত দর্শকের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। কীভাবে একটি বুলেটিনের রান-ডাউন তৈরি হয়, কোন সংবাদ আগে যাবে আর কোনটি পরে, লাইভ অনুষ্ঠানে হঠাৎ কোনো গোলযোগ হলে কীভাবে সামাল দেওয়া হয়—প্রতিটি বিষয় যেন একেকটি নতুন অধ্যায়।
দিনশেষে চ্যানেলের কার্যালয়ের একটি কোণে সবাই দাঁড়ালেন স্মারক ছবির জন্য। পেছনে দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে সময় টেলিভিশনের পরিচিত লাল লোগো, পাশের বিশাল পর্দায় চলছে সরাসরি সম্প্রচার, আর সামনে শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা ব্যানার—’বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একাডেমিক সফর, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’। ব্যানারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মুখে যেন এক অভিন্ন অভিব্যক্তি—তৃপ্তি, অনুপ্রেরণা, আর ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় সংকল্প।
বিভাগের চেয়ারম্যান ইয়াসির সিলমী এ প্রসঙ্গে বলেন, “এ ধরনের ভিজিট শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী শিক্ষা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।” সময় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি যোগ করেন, এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের পেশাগত জীবনে দীর্ঘকাল কাজে আসবে। প্রভাষক সরওয়ার কামালও ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান আর বাস্তব অভিজ্ঞতার মেলবন্ধনই গড়ে তুলতে পারে দক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাও তাঁদের মুগ্ধতা গোপন রাখলেন না। তাঁরা বললেন, সময় টেলিভিশনের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কাজের পরিবেশ দেখার অভিজ্ঞতা তাঁদের জন্য ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক। নিউজরুমের ব্যস্ততা, লাইভ সম্প্রচারের উত্তেজনা, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরির সৃজনশীলতা—সবকিছুই তাঁদের সামনে এক নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।
ফিরতি পথে এই তরুণ স্বপ্নবাজদের চোখে ছিল এক নতুন আলো। তাঁরা জানেন, আজ যাঁরা সেই নিউজরুমে বসে সংবাদ তৈরি করছেন, একদিন সেই চেয়ারে হয়তো বসবেন তাঁরাই। আর সেদিন তাঁদের কলম, ক্যামেরা আর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে সমাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাক্ষী।

