জামিন জালিয়াতি: বিচারপতির স্বাক্ষর থেকে কারামুক্তি— রহস্যময় এক ষড়যন্ত্রের কাহিনি

Supreme Court
আদালতের পবিত্র অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব জালিয়াতি। বিচারপতির কলমের কালি শুকানোর আগেই বদলে ফেলা হলো মামলার নাম, থানার ঠিকানা, অভিযোগের ধারা। আর সেই জাল কাগজের জোরেই কারাগারের লৌহকপাট খুলে বেরিয়ে গেলেন সন্ত্রাসবিরোধী মামলার এক আসামি। ঘটনাটি যখন ফাঁস হলো, তখন থমকে গেল পুরো বিচার অঙ্গন।

যেখান থেকে সব শুরু

২০২৫ সালের ১৭ই মে। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় একটি সাধারণ তৈরি পোশাক কারখানার গুদামে হানা দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। “রিংভো অ্যাপারেলস” নামের সেই কারখানার গুদাম থেকে উদ্ধার হয় ২০ হাজার ৩০০টি বিশেষ পোশাক— যা তৈরি হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আলোচিত সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যদের জন্য। দুই কোটি টাকার সেই পোশাক অর্ডার এসেছিল মংহলাসিন মারমা ও কুকি-চিন সদস্যদের কাছ থেকে।

তিনজনকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম (২৫), পোশাক তৈরির ক্রয়াদেশ দেওয়া গোলাম আজম (৪১) এবং নিয়াজ হায়দার (৩৯)। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। মামলার ভার, আইনের কঠোরতা — সব মিলিয়ে কারাগারই হয়ে ওঠে তাদের ঠিকানা।

কিন্তু সেই ঠিকানা বেশিদিন থাকেনি সাহেদুলের জন্য।

অন্ধকারে যে চাল চলা হলো

কারাগার থেকেই হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন সাহেদুল। গত বছরের ১৬ই সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের দ্বৈত বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন একই নামে— “সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র” — দুটি ভিন্ন মামলা কার্যতালিকায় ছিল। টেন্ডার নম্বর ৭৫৯৯১ ও ৭৫৯৯৩।

এখানেই লুকিয়ে ছিল সেই বিষাক্ত ফাঁদ।

আদালত যে সাহেদুল ইসলামকে জামিন দিয়েছিলেন, তার মামলার এজাহারে কুকি-চিনের পোশাক জব্দের কোনো অভিযোগ ছিল না — এজাহারটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মামলার। সেই ভিত্তিতেই দুই বিচারপতি জামিন মঞ্জুর করলেন এবং স্বাক্ষর করলেন আদেশে।

তারপর ঘটল অকল্পনীয় ঘটনা।

দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পরেই জামিন আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় সূক্ষ্মভাবে বদলে দেওয়া হয় মামলার নম্বর, থানার নাম এবং অভিযোগের ধারা। সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয় কুকি-চিনের পোশাক মামলার নম্বর ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারাগুলো। সেই জাল আদেশই পৌঁছে দেওয়া হয় কারাগারে। আর কারাগার কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ দেখেই খুলে দেয় দরজা— বেরিয়ে যান সাহেদুল ইসলাম।

এই সাত মাস কেউ টেরও পায়নি।

যেভাবে ফাঁস হলো রহস্য

মামলার অপর আসামি একই হাইকোর্টে জামিনের জন্য আবেদন করতে গিয়ে তার আইনজীবী উদাহরণ টানলেন— মুখ্য আসামি সাহেদুল ইসলাম তো আগেই জামিন পেয়ে গেছেন! সেই মুহূর্তে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কানে পৌঁছাল তথ্যটি। খোঁজ নিতে গিয়ে বেরিয়ে এলো ভয়াবহ সত্য।

রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সরাসরি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরলেন। সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রধান বিচারপতি তদন্তের নির্দেশ দিলেন রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে। সময় বেঁধে দেওয়া হলো— মাত্র ৪৮ ঘণ্টা।

রেজিস্ট্রার জেনারেল নিজেই স্বীকার করলেন, “তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির ঘটনা সত্য। তদন্ত শুরু হয়েছে।”

পাহাড়ের ছায়ায় কুকি-চিন

এই ঘটনার কেন্দ্রে যে সংগঠনটির নাম— কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট— তারা কারা? ২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় আত্মপ্রকাশ করে এই সশস্ত্র সংগঠন। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, খুমিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নাম থাকলেও মূলত বম জনগোষ্ঠীর একাংশ এতে যুক্ত বলে জানা যায়। পাহাড়ে সংগঠনটি পরিচিত “বম পার্টি” নামে।

সেই সংগঠনের জন্যই তৈরি হচ্ছিল পোশাক, একটি বৈধ কারখানার আড়ালে। আর সেই মামলার আসামিকে মুক্ত করতে ব্যবহার করা হলো বিচার বিভাগের সবচেয়ে পবিত্র দলিল— উচ্চ আদালতের জামিন আদেশ।

প্রশ্নগুলো এখনও ঝুলছে

সাত মাস আগের এই ঘটনা এতদিন কীভাবে চাপা পড়ে রইল? জাল আদেশ কে বা কারা তৈরি করল? কারাগার কর্তৃপক্ষ কি আদৌ যাচাই করেনি? এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র আছে কি?

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, “তদন্ত শেষে জড়িতদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে পারব।”

আদালত অঙ্গন এখন অপেক্ষায়। দেশবাসীও।