
সাজেকের দূর্গম পাহাড়ে যেখানে মেঘ এসে গাছের ডালে ভর করে বিশ্রাম নেয়, সেখানে এক যুবক বসে থাকেন তাঁর ছোট্ট কর্মশালায়। হাতে দা, পাশে রাখা পাকা বিমিটিংগা বাঁশের কয়েকটি টুকরো, আর সামনে একটি অর্ধসমাপ্ত পণ্য—হয়তো একটি জুম ঘর, কিংবা একটি কেটলি, কিংবা নকশাখচিত একটি পানির বোতল। দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্ন একাগ্রতায় কাজ করে চলেছেন তিনি। বাঁশের প্রতিটি স্তরে যেন তিনি বুনছেন এক একটি স্বপ্ন। তাঁর নাম রনজিৎ চাকমা।
বত্রিশ বছর বয়সী এই তরুণ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের ১০ নম্বর পাড়ার বাসিন্দা। পাহাড়ি জনপদের যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা—যেখানে জুম চাষই দীর্ঘকাল জীবিকার একমাত্র অবলম্বন—সেই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রনজিৎ বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন পথ। বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য নির্মাণের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের পরিবারের ভাগ্যই বদলাননি, বরং পাহাড়ের অর্থনীতির বুকে এঁকেছেন এক সম্ভাবনাময় চিত্র।
দূর্গম পাহাড়ি জনপদে আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে বাঁশের তৈরি এসব নান্দনিক পণ্য। পরিবেশবান্ধব এবং শৌখিন হওয়ায় এর চাহিদা বাড়ছে দিনে দিনে। সময় ও যুগের পালাবদলে নিত্যনতুন প্রযুক্তি এসেছে, প্লাস্টিক-সিরামিকের ভিড়ে বাজার ছেয়ে গেছে, তবু মানুষের পছন্দের তালিকা থেকে বাঁশের কারুপণ্য আজও বাদ পড়েনি। কখনো প্রয়োজনের তাগিদে, কখনো শৈল্পিক স্বাদ মেটাতে—দুই-ই সমানভাবে পূরণ করতে পারে বাঁশজাত পণ্য। আদি ঐতিহ্যের এই বহিঃপ্রকাশ যেন এক জীবন্ত ইতিহাস, যা প্রতিটি পণ্যের ভেতর দিয়ে কথা বলে।
রনজিৎ চাকমার হাত থেকে বেরিয়ে আসা পণ্যের তালিকা দেখলে চমকে উঠতে হয়। জুম ঘর, পানির বোতল, জগ, কেটলি, মগ, বাঁশের ট্রে—প্রতিটি পণ্যই যেন একেকটি ছোট্ট শিল্পকর্ম। কোনো মেশিন নেই, নেই আধুনিক যন্ত্রপাতির ঝলকানি। শুধু একটি দা, কিছুটা গ্যাস, পাওয়ার বন ঘাম আর একধরনের বিশেষ বার্নিশ—এই ক’টি সরঞ্জাম দিয়েই তিনি সৃষ্টি করেন বিস্ময়। প্রতিটি পণ্যে ফুটিয়ে তোলেন ফুল, প্রজাপতি আর পাতার নকশা। বাঁশের শক্ত খোলসে এমন কোমল চিত্রকল্প ফুটিয়ে তোলা—এ যেন এক বিরল মুনশিয়ানা।
কাঁচামাল হিসেবে রনজিৎ ব্যবহার করেন পাকা বিমিটিংগা বাঁশ, উড়া বাঁশ, বড়াক বাঁশ ও নুলি বাঁশ। এসব বাঁশ তিনি পাহাড় থেকে সংগ্রহ করেন অর্থের বিনিময়ে। সংগ্রহের পর শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়া—কাটা, শুকানো, বার্নিশ করা, নকশা আঁকা। একটি ছোট পণ্য তৈরিতে সময় লাগে কুড়ি মিনিটের মতো। কিন্তু কোনো জটিল নকশার বড় পণ্য তৈরি করতে গেলে সময় লেগে যায় সর্বোচ্চ দেড় দিন পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি ছোট পণ্য তৈরি করতে পারেন তিনি। সাপ্তাহিক হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়ায়—প্রায় ২০টি বোতল, ১০০টি মগ, ৫-৬টি ট্রে এবং একটি জুম ঘর।

শনিবার (২ মে) দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালি বাজারের সাপ্তাহিক হাটে নিজের তৈরি পণ্য নিয়ে এসেছিলেন রনজিৎ। সেখানেই তাঁর সঙ্গে কথা হয়। জানা গেল তাঁর জীবনের পেছনের গল্পও। একসময় সাজেকের দুর্গম পাহাড়ে জুম চাষ করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সময়ের পালাবদলে জুম চাষের আয়ে আর পরিবারের ভরণপোষণ চলছিল না। বিকল্প কিছু করার চিন্তা মাথায় ঘুরছিল দীর্ঘদিন। অবশেষে ২০১৯ সালে বাঁশের তৈরি হস্তশিল্পে মনোনিবেশ করেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন।
আজ স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে শহর, হোটেল, রিসোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে রনজিতের পণ্যের খ্যাতি। শৌখিন ক্রেতাদের কাছে এর বিশেষ কদর। বাজারে এসব পণ্য অনেকটা দুষ্প্রাপ্যও বটে, তাই দামও মেলে ভালো। তাঁর তৈরি পণ্যের দাম সাধারণত ১০০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত গড়ায়। প্রতি বাজারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হয় তাঁর। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে আয় দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কখনো বিক্রি বেশি হলে সেই অঙ্ক ৩০-৩৫ হাজার টাকাতেও পৌঁছায়। এই আয়েই পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে দিন কাটছে তাঁর।
তবে রনজিতের স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি জানালেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে আরও বড় পরিসরে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব। তাতে যেমন আদি ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, তেমনি পাহাড়ের অর্থনীতিতেও যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। তাঁর কথায় ফুটে ওঠে একজন স্বাবলম্বী উদ্যোক্তার আত্মবিশ্বাস, যিনি নিজের জীবনের লড়াই জিতে এখন স্বপ্ন দেখছেন আরও বড় পরিসরে।
দীঘিনালা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদিউজ্জামাল জীবন বললেন, “বাঁশের তৈরি হস্ত ও কারুপণ্য আমাদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। রনজিৎ চাকমা তাঁর প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব পণ্য তৈরি করে পাহাড়ের অর্থনীতিতে যে ভূমিকা রাখছেন, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।” স্থানীয় বাসিন্দারাও জানালেন, রনজিতের পণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দ্রুত। পাহাড়ি এলাকায় বিকল্প আয়ের একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে তাঁর এই উদ্যোগ।
পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে রনজিৎ চাকমার ছোট কর্মশালা থেকে যে শব্দ ভেসে আসে—দা’র টুকটাক আঘাত, বাঁশ কাটার মৃদু কণ্ঠ—সেগুলো যেন এক নিঃশব্দ বিপ্লবের সুর। যে বিপ্লবে নেই কোনো হট্টগোল, নেই উচ্চকিত প্রচার। আছে শুধু একজন মানুষের অদম্য ইচ্ছা, পরিশ্রমের সততা আর ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা।
বাঁশের প্রতিটি ফালি, প্রতিটি গিঁট, প্রতিটি নকশায় লুকিয়ে আছে রনজিতের গল্প। সেই গল্প হয়তো পাহাড়ি জনপদের আরও অনেক তরুণকে দেখাতে পারে এক নতুন দিশা—যেখানে নিজের শিকড়ের কাছে দাঁড়িয়েই বদলে ফেলা যায় ভাগ্যের চেহারা।
