
ধর্ষকরা পলাতক, মামলায় চার দিন দেরি—আনোয়ারায় কে আড়াল করল কাকে?
রাত তখন দশটা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের পূর্ব গহিরা গ্রামের এক পরিচিত পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল ১৪ বছরের এক কিশোরী। গন্তব্য তার খালাতো বোনের বাড়ি— কাছেই, চেনা পথ। কিন্তু সেই পথ সেদিন তার জন্য নিরাপদ ছিল না। হাড়িয়া পাড়ার একটি মুদি দোকানের সামনে পৌঁছাতেই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাতের শুরু হয়।
সেই রাতটি ছিল গত ২৭ এপ্রিল, সোমবার।
যেভাবে ঘটল বিভীষিকার রাত
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রায়পুর এলাকার ময়না গাজীর বাড়ির বাসিন্দা আবু তাহের (৪২) সেই কিশোরীকে জোরপূর্বক দোকানের ভেতরে টেনে নিয়ে যায় এবং তাকে ধর্ষণ করে। ঘটনা এখানেই থামেনি। বিষয়টি জানতে পেরে আসে আরও তিনজন— পূর্ব গহিরার রবিউল হোসেন ওরফে চুমকিয়া (২৪), মো. ফারুক (২৩) এবং আনোয়ার হোসাইন (২২)। তারা কিশোরীকে ভয় দেখিয়ে কাছের একটি বিলে নিয়ে যায়। সেখানে রাতভর পালাক্রমে চলে অমানবিক নির্যাতন।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শেষ হয় তাদের পাশবিকতা। সকালে ধুলো-কাদা মাখা শরীরে বাড়ি ফেরে কিশোরীটি। কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলে রাতের সেই বিভীষিকার কথা।
মামলা করতে গিয়ে বাধার দেয়াল
সন্তানের কথা শুনে মা ছুটলেন থানায়। কিন্তু বিচার পাওয়ার পথও সহজ ছিল না। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, মামলা করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল থেকে তাদের নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। চাপ আসে, ভয় দেখানো হয়, পথ আটকানো হয়।
চারটি দিন কেটে যায়। এই চার দিনে পরিবারটি কেবল বিচারের দরজায় ধাক্কা দিয়ে যায়— ফিরে আসে খালি হাতে। অবশেষে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে আসার পর শনিবার (২ মে) সকালে আনোয়ারা থানায় মামলা গ্রহণ করা হয়।
মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করেন ভুক্তভোগীর মা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— এই চার দিন কি স্রেফ প্রশাসনিক জটিলতা, নাকি প্রভাবশালীদের আড়াল করার কৌশলী বিলম্ব?
ক্ষমতার ছায়ায় ধর্ষক— প্রভাবশালী ভাইয়ের পরিচয়
এখন স্পষ্ট হচ্ছে, কেন মামলা করতে গিয়ে এত বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল ভুক্তভোগীর পরিবারকে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধান আসামি আবু তাহেরের সহোদর ভাই হলেন গাজী মো. নাছির উদ্দীন— যিনি শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সদস্য সচিব পদে রয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের এই ছায়া ব্যবহার করেই কি ধর্ষকের পক্ষে চাপ তৈরি করা হয়েছিল? পরিবারের ওপর যে ‘প্রভাবশালী মহলের’ চাপের কথা বলা হচ্ছে, তার পেছনে কি এই রাজনৈতিক সংযোগ কাজ করেছে?— এই প্রশ্নগুলো এখন এলাকাবাসীর মুখে মুখে ফিরছে।
পুলিশ বলছে, ছাড় নেই
আনোয়ারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কিশোরীকে উদ্ধার করে চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, “অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
তবে মামলা দায়েরের সময়ে সব আসামিই পলাতক। এলাকায় ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভের আগুনে তেল ঢেলেছে এই তথ্যটিই।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই পূর্ব গহিরা ও আশপাশের এলাকায় চাপা ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে। স্থানীয়রা একটাই দাবি তুলছেন— দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তারা প্রশ্ন করছেন, একটি কিশোরী রাতে পথ হেঁটে আত্মীয়ের বাড়ি যেতে পারবে না— এটা কোন সমাজ? আর ধর্ষণের পর বিচার চাইতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হবে— এটা কোন বিচার ব্যবস্থা?
শেষ কথা নয়, শুরুর প্রশ্ন
১৪ বছরের একটি মেয়ে এখন শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি বহন করছে এক গভীর মানসিক আঘাত। রাষ্ট্র তাকে সময়মতো সুরক্ষা দিতে পারেনি, থানার দরজা তার জন্য সহজে খোলেনি। চার দিনের সেই নীরবতা স্রেফ দেরি নয়— এটি একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতার নীরব স্বীকারোক্তি।
এখন দেখার বিষয়, আদালতের আলো সেই অন্ধকার বিলের প্রতিশোধ নিতে পারে কিনা।
