
দেশ চলছে। সরকারি দপ্তরে ফাইল নড়ছে, সিল পড়ছে, চিঠি যাচ্ছে। কিন্তু এই চলার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অস্বস্তিকর সত্য— জনপ্রশাসনের প্রায় পঁচিশ ভাগ পদ আজ শূন্য। অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৫১টি পদের বিপরীতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদে কোনো মানুষ নেই। চেয়ার আছে, টেবিল আছে, নথি আছে— শুধু নেই লোক।
অথচ দেশে বেকারের সংখ্যা কম নয়। লক্ষ লক্ষ তরুণ সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষায় বসে আছেন। তাহলে এই শূন্যতা কেন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে এক জটিল, অস্বস্তিকর এবং কখনো কখনো হতাশাজনক চিত্র।
ভয় পাচ্ছেন কর্তারা
সরকারি নিয়োগ মানেই এখন ঝুঁকি— এটাই যেন দস্তুর হয়ে গেছে। জনপ্রশাসনের এক অতিরিক্ত সচিব জানালেন তার পরিচিত এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কথা, যিনি নিয়োগ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে শেষমেশ পদোন্নতিই পাননি। এই একটি উদাহরণই যথেষ্ট বুঝতে— কেন প্রশাসনের ভেতরে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে এত অনীহা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আব্দুল ওয়াদুদ সরাসরি বললেন, “শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এখন উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ ঝুঁকি এখন আর কেউ নিতে চান না।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা আরও হতবাক করে দেওয়ার মতো। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগে কোনো কারণ ছাড়াই তাকে একই পরীক্ষা পাঁচবার নিতে হয়েছে।
ডিও লেটারের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া নিয়োগ
একটি সাধারণ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেই শুরু হয় তদবিরের ঢল। এক সাবেক জেলা প্রশাসক, এখন যুগ্মসচিব, জানালেন তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা। মাত্র ৫০ জন এমএলএসএস নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর একজন এমপি একাই পাঠিয়েছেন ৫২টি ডিও লেটার। জেলায় আরও চারজন এমপি ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিয়োগ না দিয়েই তিনি বদলি হয়ে গেছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানালেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একটি পদের জন্য ৮০ থেকে ১২০টি পর্যন্ত ডিও লেটার আসে। তার কথায়, “কোনটি রেখে কোনটি ফেলব? কেউ কারও চেয়ে কম প্রভাবশালী নন। যার ডিও লেটার অনার করা হবে না, নির্ঘাত তার রোষানলে পড়তে হবে।”
পুরনো বিধি, নতুন সংকট
নিয়োগের আরেকটি বড় বাধা হলো পুরনো নিয়োগবিধি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব জানালেন, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগের। সেই পুরনো বিধির আলোকে এখনকার প্রেক্ষাপটে নিয়োগ দিতে গেলেই জটিলতা তৈরি হয়। ফলে নিয়োগ এগোয় না, পদ ফাঁকাই থাকে।
জনপ্রশাসনের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানালেন, মামলার কারণে অনেক নিয়োগ আটকে আছে। তবে তিনি স্বীকার করলেন, তদবির “ছিল, আছে এবং থাকবে।” এর মধ্যেই সমপ্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করাই লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি
শুধু তদবির নয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের আতঙ্কও নিয়োগকারীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বললেন, “দালালচক্র তো আছেই। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করবেই।” ফাঁস হলে তদন্ত কমিটি, গণমাধ্যমে সমালোচনা— সব দায় গিয়ে পড়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে।
এর চেয়েও গভীর সংকটের কথা বললেন তিনি— যাদের নিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, তারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এখন চরম পর্যায়ে।
যে মন্ত্রণালয়গুলো সবচেয়ে ফাঁকা
সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে— ৭৪ হাজার ৫৭৪টি। এরপরেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪৪ হাজার ৭৯০টি। এই দুটি মন্ত্রণালয়েই মোট শূন্য পদ ১ লাখ ১৯ হাজারেরও বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে ২৬ হাজার, স্বরাষ্ট্রে ২০ হাজার, রেলপথে ১৫ হাজারের বেশি পদ শূন্য।
শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য, খাদ্য, প্রতিরক্ষাসহ প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই হাজার হাজার পদ বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা পড়ে আছে।
জনসেবা কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না?
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া সরাসরি বললেন, “জনবল শূন্য থাকলে জনসেবা বিঘ্নিত হবে।” তিনি সরকারকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আহ্বান জানালেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ অবশ্য বললেন, যেসব পদে আইনি জটিলতা নেই, সেখানে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এবং চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সাড়ে চার লাখেরও বেশি শূন্য পদ স্রেফ সংখ্যা নয়— এটি একটি ব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে লক্ষ লক্ষ বেকার তরুণ, অন্যদিকে লক্ষাধিক ফাঁকা চেয়ার। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তদবির, ভয়, পুরনো বিধি আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এক অদৃশ্য দেয়াল।
এই দেয়াল না ভাঙলে জনপ্রশাসন চলতে থাকবে— তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আর সেই খোঁড়ানোর মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
