কলম যখন অস্ত্র: খবরের আঘাতে ভাঙল সিন্ডিকেট, রক্ষা পেল বন, ফিরল অধিকার


একটি খবর। শুধু একটি খবর— কিন্তু সেই খবরের ধাক্কায় কাঁপল সিন্ডিকেট, নড়েচড়ে বসল প্রশাসন, মামলা দায়ের হলো, পদাবনতি হলো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার। চকরিয়ার বারো হাজার তামাক চাষি যে শোষণের শিকার হয়ে আসছিলেন বছরের পর বছর, একজন সাংবাদিকের কলম সেই জাল কেটে দিল।

এটাই ইমপ্যাক্ট সাংবাদিকতা। এটাই একুশে পত্রিকা।

এপ্রিল ২০২৬-এ বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকতায় সমাজে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পত্রিকা ঘোষণা করেছে মাসের সেরা ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’। এপ্রিলের ‘সেরা ইমপ্যাক্ট সাংবাদিক’ নির্বাচিত হয়েছেন চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি এম. জিয়াবুল হক। একইসঙ্গে অনবদ্য সাংবাদিকতার জন্য ‘স্পেশাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন মহেশখালী প্রতিনিধি ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, পটিয়া প্রতিনিধি রবিউল হোসেন এবং সাতকানিয়া প্রতিনিধি মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।

চাষির হাসি, বনের মুক্তি— একজন সাংবাদিকের কলমে

চকরিয়ার তামাক চাষিরা দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের খপ্পরে ছিলেন। ন্যায্য দাম তো দূরের কথা, ফসলের দামও নির্ধারিত হতো সিন্ডিকেটের খেয়ালে। এম. জিয়াবুলের ধারাবাহিক ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন সেই অন্ধকারে আলো ফেলে। তাঁর প্রতিটি খবর কেবল পাঠক পড়েনি— প্রশাসনও পড়েছে, এবং নড়েচড়ে বসেছে।

কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত: ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত ‘টোব্যাকো কোম্পানির সিন্ডিকেটে দিশেহারা চকরিয়ার ১২ হাজার তামাক চাষি, সড়কে বিক্ষোভ’ প্রতিবেদনের পর প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। মাত্র একদিনের ব্যবধানে, ২৫ এপ্রিল, ফলোআপ সংবাদের শিরোনাম হয়: ‘একুশে পত্রিকায় সংবাদ: ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা পেলেন ১২ হাজার তামাক চাষি।’ একটি খবরে বদলে গেল ১২ হাজার পরিবারের ভাগ্য।

বনখেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: ১ এপ্রিল প্রকাশিত ‘মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানে পাকাবাড়ি নির্মাণের হিড়িক, বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন’ প্রতিবেদনের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ৯ এপ্রিল গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। ২০ এপ্রিল ফলোআপে প্রকাশিত হয়: ‘ঘুষ নেওয়ায় বনবিট কর্মকর্তা প্রত্যাহার, ১২ মামলা।’ জাতীয় উদ্যানের জঙ্গলে যারা অট্টালিকা তুলছিল, তারা এখন কাঠগড়ায়।

জনদুর্ভোগ লাঘব: ১৩ এপ্রিল প্রকাশিত ‘চকরিয়ার বরইতলী বেইলি সেতু এখন মরণফাঁদ, গাড়ি ধীর করলেই ডাকাতের হানা’ সংবাদের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ১৮ এপ্রিল ফলোআপে আসে সুখবর: ‘বেইলি সেতুর সংস্কার শুরু, দুর্ভোগ থেকে মুক্তি।’ স্বস্তি ফেরে আড়াই হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

অবৈধ দখল উচ্ছেদ: ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত ‘চকরিয়ায় সরকারি আশ্রয়ণের পাহাড় কেটে মাটি লুট, প্লট বাণিজ্যের হিড়িক’ সংবাদের পর প্রশাসন অভিযানে নামে। ২০ এপ্রিল ফলোআপে প্রকাশিত হয়: ‘পাহাড় কেটে তৈরি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ।’

মানবপাচার উন্মোচন: ৩০ মার্চ সাগরপথে মানবপাচার নিয়ে সতর্কতামূলক সংবাদ প্রকাশিত হলে অনেকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ১৮ এপ্রিলের ফলোআপ শিরোনাম বলে দিল সত্যিটা: ‘একুশে পত্রিকার সংবাদ সত্য প্রমাণিত: আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবিতে পেকুয়ার ১২ জন নিখোঁজ।’

স্পেশাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড: আরও তিন কলমযোদ্ধা

এপ্রিলে অনবদ্য সাংবাদিকতার জন্য ‘স্পেশাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন আরও তিনজন, যাঁদের প্রতিটি খবর সমাজে রেখেছে দৃশ্যমান ছাপ।

ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ (মহেশখালী): ৪ এপ্রিল প্রকাশিত ‘মহেশখালীতে ৫ হাজার একর প্যারাবন গিলছে রাজনৈতিক চক্র: গ্রেপ্তার নেই, থামছে না দখল’ সাহসী অনুসন্ধানের পর পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ১০ এপ্রিল ফলোআপে প্রকাশিত হয়: ‘একুশে পত্রিকায় সংবাদ: মহেশখালীতে প্যারাবন দখল মামলার আসামি রিমন গ্রেপ্তার।’ পুলিশ নিজেই একুশে পত্রিকার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে।

রবিউল হোসেন (পটিয়া): ৬ এপ্রিল প্রকাশিত ‘পটিয়ায় চাঁনখালী খালে সেতু নির্মাণে গাফিলতি, এক মাসে দুই নৌকা ডুবি’ সংবাদের জেরে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। ১২ এপ্রিল ফলোআপে প্রকাশিত হয়: ‘নাইখাইন সেতুর শিট পাইল সরাতে পটিয়ার এমপির নির্দেশ।’ এছাড়া ১১ এপ্রিল বৈশাখী মেলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নিয়ম ভঙ্গের খবরের পরদিন, ১২ এপ্রিল ফলোআপে আসে: ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে পটিয়ায় মাঠে নামলেন ইউএনও।’

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন (সাতকানিয়া): ১২ এপ্রিল ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে খবর প্রকাশের মাত্র একদিনের মাথায় প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। ১৩ এপ্রিল ফলোআপে প্রকাশিত হয়: ‘একুশে পত্রিকায় সংবাদ: সাতকানিয়ায় ভূমি অফিসের দুই কর্মকর্তাকে শোকজ।’ দুর্ভোগে পড়া সাধারণ মানুষ পেলেন জবাবদিহির নিশ্চয়তা।

‘জিতবে মানুষ’

একুশে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নজরুল কবির দীপু বলেন, “আমরা কেবল খবর প্রকাশেই বিশ্বাসী নই, খবরের পেছনের খবর এবং তার বাস্তবিক সমাধানে বিশ্বাস করি। যে খবর দুর্নীতিবাজের শাস্তি নিশ্চিত করে, কৃষকের মুখে হাসি ফোটায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে— সেটিই আমাদের লক্ষ্য। বদলাবে সমাজ, জিতবে মানুষ।”

সংবাদপত্র কেবল সমাজের আয়না নয়— এটি পরিবর্তনের হাতিয়ার। একুশে পত্রিকার এপ্রিলের প্রতিবেদনগুলো সেই সত্যকেই আরেকবার প্রমাণ করল।