ঝড়ের পরেও থামেনি কৃষক


আকাশ কখনো মেঘলা, কখনো রোদ। থামছে না ঝড়ের আতঙ্ক। কিন্তু রাঙ্গুনিয়ার কৃষক থামেননি। সূর্যের মুখ দেখা মাত্রই মাঠে ছুটছেন তারা— কোথাও কিছুটা নুয়ে পড়া ধান টেনে তুলতে, কোথাও পাকা ধান দ্রুত ঘরে নিতে। যা বাঁচানো যায় তা বাঁচাতে এই মানুষগুলোর লড়াই প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, জীবনের জন্য।

গত ২৮ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে একের পর এক কালবৈশাখী আঘাত হেনেছে। চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলার মতো রাঙ্গুনিয়াও পড়েছে সেই তাণ্ডবের কবলে। গাছ ভেঙেছে, ঘর উড়েছে, বিদ্যুৎ গেছে— তবে মাঠের চিত্র একেবারে বিপর্যস্ত না হলেও কিছু নিচু জমিতে পানি জমে ধান নুয়ে পড়েছে।

ঝড়ের রাতের পর ভোর

সেই রাতের কথা এলাকার মানুষ ভুলতে পারছেন না। দমকা হাওয়া, বজ্রপাত আর মুষলধারে বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন রাস্তায় গাছ ও ডালপালা ভেঙে পড়ে। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ খুঁটি ভেঙে, ৩৩ কেভি ও ১১ কেভি লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধকারে ডুবে যায় বহু এলাকা। কোনো কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরতে লেগেছে প্রায় এক সপ্তাহ।

ঘরবাড়ি রেহাই পায়নি। কোথাও চাল উড়ে গেছে, কোথাও গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে বসতঘরের ওপর। গোয়ালঘর, দোকানপাট— সবখানেই ক্ষতির ছাপ। বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

মাঠের চিত্র — ক্ষতি আছে, তবে আশাও আছে

সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিস্থিতি একেবারে বিপর্যয়কর নয়। বেশিরভাগ জমিতে ধান দাঁড়িয়ে আছে, সোনালী রং ধরেছে। কৃষকরাও মাঠে নেমে পাকা ধান কাটছেন স্বাভাবিকভাবেই। তবে কিছু নিচু জমিতে পানি জমে ধান নুয়ে পড়েছে, যা নিয়ে চিন্তা আছে।

চলতি মৌসুমে রাঙ্গুনিয়ায় ৯ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। শুধু গুমাই বিলেই ধান চাষ হয়েছে ৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া উপজেলাজুড়ে ৬৪০ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানালেন, কালবৈশাখীর কারণে কিছু জায়গায় ধান হেলে পড়ে মাটির সঙ্গে লেগে গেছে। প্রায় ৭ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরও প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে। তবে সামগ্রিকভাবে এই মৌসুমের ফসল তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির ফসল পুনরুদ্ধার সম্ভব বলেও আশা রাখছেন তিনি।

হার না মানা মানুষের গল্প

তবু কৃষক দমেননি। সোমবার সরেজমিন দেখা গেছে, রোদেলা আকাশের নিচে কৃষকরা দলবেঁধে মাঠে নেমেছেন। কেউ কোমর বাঁকিয়ে ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন— মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে স্বস্তির আভাস। আকাশে একটুখানি রোদের ফাঁক দেখা দিলেই মাঠে নামছেন তারা। প্রকৃতির কাছে হার মানার মানুষ এরা নন— বারবার উঠে দাঁড়ানোই এদের পরিচয়।

কৃষি বিভাগ কী করছে

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ধান ঘরে তোলায় সরাসরি কোনো শ্রমিক সহায়তা না থাকলেও কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। ধান কাটা শেষ হলে সার্ভে করে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর একের পর এক সতর্কতা জারি করে যাচ্ছে। কালবৈশাখীর মৌসুম এখনো শেষ হয়নি।