- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ছনুয়া গ্রামে নিজের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বসে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছেন নুরুল হোসেন। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া গ্রাম। রোদে ঝলমল এক বিকেলে নুরুল হোসেন বসে আছেন তাঁর অটোরিকশায়। গাড়িটি চকচকে, কিন্তু চালকের মুখে একধরনের চাপা উদ্বেগ।
“নব্বই হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি,” বললেন বত্রিশ বছরের এই যুবক। “চল্লিশ সপ্তাহে শোধ দিতে হবে এক লাখ দুই হাজার। তার ওপর ঘুষ দিতে হলো আলাদা।”
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব বেড়েছে গত কয়েক বছরে। পানির তাপমাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে জেলিফিশও, ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছে জাল থেকে। জেলে ছিলেন নুরুল হোসেন; ২০২৫ সালে সেই পেশাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন।
একা নন তিনি। প্রতি বছর শত শত জেলে সাগর ছেড়ে দিচ্ছেন— মাছ কমছে, আয় কমছে— জানালেন বাঁশখালী ফিশিং বোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস শুক্কুর। সমিতিটি উপজেলার প্রায় ২০০ নৌকার মালিককে প্রতিনিধিত্ব করে।
বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্র ০.৩ শতাংশের জন্য দায়ী বাংলাদেশ। অথচ চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্সে এই ছোট দেশটি আছে নবম স্থানে— বলছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের ভেতরে ঘরছাড়া হবেন প্রায় দুই কোটি মানুষ, পাল্টে যাবে তাঁদের জীবিকা।

বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকে অন্য পেশায় ঢোকেন, আর আস্তে আস্তে সেখানেই থিতু হয়ে যান। সামান্য সঞ্চয় আর ভারী ঋণ সঙ্গে নিয়ে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর পথ। আর কেউ কেউ বিকল্প না পেয়ে পা বাড়াচ্ছেন মৃত্যুঝুঁকির দিকে।
যেমন আজিজুর রহমান। বাঁশখালীর আরেক জেলে ছিলেন তিনি। গত ৪ এপ্রিল মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টায় আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়ে গেলেন— জানালেন শুক্কুর।
“এই সাগর আর আগের সাগর নেই,” বললেন নুরুল হোসেন। “ঝড় আসে কোনো পূর্বাভাস ছাড়া। ইলিশ তো জাল থেকেই হারিয়ে গেছে। গত কয়েক বছর বারবার খালি নৌকায় ফিরেছি তীরে। শেষমেশ আর উপায় ছিল না, সাগর ছাড়তেই হলো।”
বাংলাদেশের উপকূল নিয়ে গবেষকরা এই পরিবর্তনগুলো বছরের পর বছর ধরে নথিভুক্ত করছেন— উষ্ণ হয়ে ওঠা বঙ্গোপসাগর, প্রচণ্ড হচ্ছে যেসব ঘূর্ণিঝড়, ইলিশ চলে যাচ্ছে যে দূরের জলসীমায় জেলেরা পৌঁছাতে পারেন না সেদিকে। নুরুল হোসেন এই গবেষণাগুলোর একটিও পড়েননি। তিনি শুধু এগুলোর ভেতর দিয়ে বেঁচে আছেন।
হোসেনদের জন্য সরকারের নীতিও আছে, কাগজে-কলমে।
বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা এনডিসি ৩.০–তে বলা আছে, জলবায়ু পরিবর্তনে জীবিকা হারানো মানুষের পাশে দাঁড়াতে গড়ে তোলা হবে বিশেষ তহবিল। সহজ শর্তে দেওয়া হবে ঋণ। থাকবে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ।
সাম্প্রতিক শ্রম সংস্কার কমিশনের (এপ্রিল ২০২৫) সুপারিশেও একই সুর— অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের, যেমন ইভি চালকদের, রক্ষাকবচ দিতে গঠন করতে হবে ‘জাতীয় জলবায়ু ও ন্যায্য রূপান্তর তহবিল’, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো।
কিন্তু চার ডজনের বেশি প্রান্তিক ইভি চালক ও ঋণদাতা এনজিও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল, এসব নীতির বাস্তবায়ন এখনো যথাযথভাবে শুরুই হয়নি।
গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এ চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারীর হাজারী দীঘির পাড় এলাকায় গিয়ে এই প্রতিবেদক দেখেছেন— দশটি এনজিও অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঋণপ্রার্থীদের দীর্ঘ সারি।
সবগুলো সংস্থার কর্মকর্তাই নিশ্চিত করলেন একটি কথা: ইভি চালকদের জন্য আলাদা কোনো ঋণ-সুবিধা নেই। আছে শুধু সাধারণ ঋণ, যার সুদের হার প্রায় ২৪ শতাংশ।
“আমরা সাধারণ ঋণই দিই। গাড়ির ঋণে ঝুঁকি বেশি, তাই শর্তও কড়া,” বললেন এসকেএস ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তা— নাম প্রকাশ না করার শর্তে।
চড়া সুদের পাশাপাশি ঋণ পেতে হলে কর্মকর্তাদের ঘুষও দিতে হয় প্রায়শই। নুরুল হোসেনকেই যেমন ঋণ অনুমোদনের জন্য আলাদা করে গুনতে হয়েছে ৫০০ টাকা।
এই প্রতিবেদনের জন্য জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এক গ্রামীণ বাজারে যে ২৫ জন অটোরিকশা চালকের সঙ্গে কথা হয়, তাঁদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই বললেন— ঋণ পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী রহিম উদ্দিনও তাঁদের একজন। স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে ঘুষের টাকা জোগাড় করেছেন তিনি।
“বড়লোকেরা ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে যায়, ফেরতই দেয় না। আর আমরা একদিন কিস্তি দিতে দেরি করলেই বাড়ির সামনে এসে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে,” বললেন তিনি।
বাংলাদেশের আরও অনেক খাতের মতোই, এনজিও ঋণে ঘুষের চর্চা যেন এক প্রকাশ্য গোপনীয়তা।
“নথিভুক্ত খরচের বাইরেও কিছু খরচ আছে। সবাই জানে,” ঢাকাভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বাস্তবের একজন কর্মকর্তা মৃদু হেসে বললেন ঘুষ-প্রসঙ্গে। তিনিও চাননি নাম প্রকাশ পাক।
চড়া সুদের এই ঋণচক্র চালকদের জীবিকার ওপর ছায়া ফেলেছে গভীরভাবে। তাঁদের অনেকেই একসময় সাগরে জাল ফেলেছেন।
এই প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা প্রায় চার ডজন ইভি চালক জানিয়েছেন, দৈনিক যা আয় হয় তার প্রায় অর্ধেকই চলে যায় কিস্তি শোধ করতে। বাকিটা ভাগ হয় ব্যাটারি চার্জ আর পরিবারের পেট চালানোর মধ্যে।
ফলে গত ছয় মাসে অনেক চালক মাছ-মাংস কেনাই বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোও বন্ধ রেখেছেন।
ইভি চালকদের জন্য সরকার যে ভর্তুকিযুক্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে, এই চালকদের কেউই সে বিষয়ে কিছু জানেন না।
প্রচলিত ব্যাংকগুলো এঁদের ঋণ দেয় না— যোগ্যতাই হয় না। ফলে এনজিওই হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের একমাত্র ভরসা।
আয়ের আর কোনো পথ নেই, আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কাও বাড়ছে— তাই ক্রমেই বেশি সংখ্যক মানুষ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে রাস্তায় নামছেন। আর রাস্তায় গাড়ি বাড়লে আয়ও কমছে আনুপাতিকভাবে।
“গাড়ি বাড়লে ভাড়া কমে। এখন কিস্তি দিতেই হিমশিম খাচ্ছি,” বললেন চট্টগ্রামের সাহাব উদ্দিন। কৃষিকাজ ছেড়ে অটোরিকশায় এসেছেন তিনি কিছুদিন আগে।
উদ্দিন আর হোসেনদের যখন এই অবস্থা, তখন সরকারের নীতির আনুকূল্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন আরেক দল ক্রেতা— যাঁদের পকেট অনেক ভারী।
শিল্প মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে প্রস্তাবিত ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫’। অংশীজনদের মতামতের জন্য এটি প্রকাশ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়েছে— সম্পূর্ণ আমদানি করা ইভিতে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক মিলিয়ে যে মোট করের বোঝা ৮৯ শতাংশ, সেটা কমিয়ে আনা হবে ৩৭ শতাংশে।
মন্ত্রণালয়ের নীতি, আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব সুলতানা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, চলতি বছরেই খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। “আগামী দিনে দেশে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যবহার বাড়বে। দেশেই যেন ইভি ও তার যন্ত্রাংশ তৈরি করা যায়, সেটা নিশ্চিত করাই এই নীতিমালার লক্ষ্য।”
কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কর-ছাড়ের সুফল পৌঁছাবে না সেইসব মানুষের কাছে— যাঁরা আসলে দেশের বেশিরভাগ ইলেকট্রিক ভেহিকেল চালান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মো. আলাউদ্দিন মজুমদারের মতে, এই করছাড়ের সুবিধা পাওয়া উচিত ছিল ছোট ব্যাটারিচালিত যান কিনতে চাওয়া মানুষদের, ধনী আমদানিকারকদের নয়। “সেটা হয়নি,” বললেন তিনি। যে দেশে একটি সম্পূর্ণ আমদানি করা ইভির দাম অটোরিকশা চালকের বছরের আয়ের বহুগুণ, সেখানে এই করছাড় আসলে ডিলার, করপোরেট ফ্লিট আর সচ্ছল ক্রেতাদের জন্য একধরনের সুবিধা— হোসেনদের জন্য নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক চৌধুরী লিয়াকত আলী স্বীকার করলেন, ইভি প্রসারে দেশে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প এই মুহূর্তে নেই।
“ক্ষুদ্র পর্যায়ে অর্থায়ন শুরু করতে পারলে হয়তো এদের পাশে দাঁড়ানো যাবে,” বললেন তিনি।
কেন এই অবস্থা— তা জানতে গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী সচিব তসলিমা মোস্তারী ও সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শামসুল আরিফিনের কাছে নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল, দ্রুত জবাবের অনুরোধসহ। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কেউই উত্তর দেননি।
অধ্যাপক আলাউদ্দিন মজুমদার বলছেন, “আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন কর্পোরেটবান্ধব। বড় গোষ্ঠীগুলো সহজে ঋণ পায়, গরিবরা পায় না। আর বাজার অর্থনীতিতে শুধু আদেশ দিয়ে কাজ হবে না— ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনাও দিতে হবে।”
তাঁর মূল্যায়ন, একটি ব্যাংক যদি সাধারণ ঋণে ১১ শতাংশ মুনাফা করে, ইভি ঋণে তারা ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে রাজি হবে না। সেই ব্যবধান ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করতে হবে সরকারকেই— মত তাঁর।
চট্টগ্রামের ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের জেলা আহ্বায়ক আল কাদেরী জয় বললেন, “শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সরকার নীতি বানায়। বৈঠক হয় বড় আমদানিকারকদের সঙ্গে। আমাদের কেউ ডাকে না।” এনজিওর বদলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
এই প্রতিবেদনের জন্য গত ৬ এপ্রিল ইমেইলে আশা, এসডিআই, কোস্ট ফাউন্ডেশন, ব্যুরো বাংলাদেশ, এসকেএফ ফাউন্ডেশন, বাস্তব, এসএসএস, রিক, এসকেএস ও প্রত্যাশী— দশটি এনজিওর প্রধান কার্যালয়ে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয়। ঘুষ, বাধ্যতামূলক বিমা ও চড়া সুদের অভিযোগ নিয়ে তাদের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল। দুদিন সময় দেওয়া হয়েছিল প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে। ৬ মে প্রকাশের সময় পর্যন্ত কেউই উত্তর দেয়নি।
বাঁশখালীর নুরুল হোসেন এই হিসাব-নিকাশ ভালোই জানেন। প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামেন। মাথার ভেতর কিস্তির হিসাব এক মুহূর্তের জন্যও থামে না। ঢাকার কোনো মন্ত্রণালয়ে তাঁর নাম উঠেছে কি না, তিনি জানেন না। এনডিসি ৩.০ নামের কোনো নথিতে তাঁদের জন্য কী প্রতিশ্রুতি লেখা আছে— সেটাও তাঁর অজানা।
তিনি শুধু এটুকু জানেন: মাস শেষে টাকা না হলে গাড়িটাই তুলে নিয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরকার হয়তো ঘোষণা দেবে— দেশে ইভির সংখ্যা বাড়ছে। সেই সংখ্যায় গণনা করা হবে নুরুল হোসেনের গাড়িটিও। তাঁর মতো আরও হাজার হাজার চালকের গাড়িও থাকবে সেই হিসাবে। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনের গল্প— ঘুষের চাপ, পিষে ফেলা সুদ, বন্ধক রাখা গয়না, মাছ-মাংস কিনতে না পারা— সেই গল্প কোনো পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে না।
[এই প্রতিবেদনটি থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তৈরি। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর দায়দায়িত্ব একান্তই লেখক ও প্রকাশকের।]

