
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার হাওলা ডিসি সড়কের পাশে দাঁড়ালে এখন চোখে পড়ে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য। ছন্দারিয়া খালের ওপর বিস্তৃত হয়ে আছে সারি সারি লাল রঙের ভারী লোহার বিম। সরকারি কংক্রিটের গাইড ওয়ালের গায়ে কাটা খাঁজে বসানো সেই বিমগুলো এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সেতুর রূপ নিচ্ছে। সড়কের পাশ দিয়ে যাওয়া যে কেউ থমকে দাঁড়াচ্ছেন—কারণ এই নির্মাণের পেছনে নেই কোনো সরকারি অনুমতি, নেই কোনো বৈধ নকশা।
সরেজমিন দেখা গেছে, অলিবেকারির মোড় এলাকায় ছন্দারিয়া খালের ভাঙন রোধে সড়ক ও জনপথ বিভাগ যে কংক্রিটের গাইড ওয়াল নির্মাণ করেছিল, সেই দেয়ালের একাধিক স্থানে প্রায় দুই ফুট গভীর করে খাঁজ কেটে লোহার বিম বসানো হয়েছে। বিমগুলো খালের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশের সড়কে এখনো যানবাহন চলছে স্বাভাবিকভাবে, কিন্তু যে দেয়াল সেই সড়ককে খালের ভাঙন থেকে আগলে রাখছিল, তার কাঠামো এখন দুর্বল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের মুফতি পাড়ার বাসিন্দা এবং দুবাই প্রবাসী মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ করছেন। অলিবেকারি মোড় থেকে জোট পুকুর পাড় পর্যন্ত তার কৃষি জমিতে আবাসিক প্লট বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেই জমিতে যানবাহন ঢোকার সুবিধার জন্যই খালের ওপর এই সেতু তৈরি করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম গাইড ওয়াল কাটার কথা সরাসরি স্বীকার করেন। তার যুক্তি, এক্সক্যাভেটর ও ভারী যানবাহন ওঠানোর জন্য দেয়ালের দেড় ফুট কাটা ছাড়া বিকল্প ছিল না এবং কাজ শেষে নিজ দায়িত্বে তা মেরামত করে দেবেন। এর চেয়েও অবাক করা বিষয় হলো, তিনি দাবি করেছেন সওজ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, এসি ল্যান্ড, ইউএনও এবং চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক পর্যন্ত তাকে মৌখিক বা লিখিত অনুমতি দিয়েছেন।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দাবির কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি।
সওজের বোয়ালখালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম শাহরিয়ার কামাল জানান, স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি রাতেই জাহাঙ্গীর আলমকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম সেই মুহূর্তে রাজি হলেও পরে রাতের মধ্যেই কাজ আবার শুরু হয়। এস এম শাহরিয়ার কামাল জানান, তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানিয়েছেন, এই নির্মাণের জন্য সওজের পক্ষ থেকে কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি আরও জানান, অবৈধ এই নির্মাণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মামলা করার নির্দেশনা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও প্রশাসন কয়েকবার এই নির্মাণকাজে বাধা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই কাজ থেমেছে সাময়িকভাবে, পরে আবার শুরু হয়েছে।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, গাইড ওয়ালের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে বর্ষা মৌসুমে উপজেলার প্রধান সড়কটি খালের ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। সেটি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এলাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ।
মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন জানালেও এখন পর্যন্ত নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সরেজমিন দেখা গেছে সেতুর কাঠামো ইতিমধ্যে অনেকটাই দাঁড়িয়ে গেছে। প্রশাসন কখন এবং কতটা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেয়—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
