যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি


সশস্ত্র সংঘাতে চিকিৎসাসেবার সুরক্ষা নিশ্চিত ও জোরদার করার জন্য বিশ্ব রাষ্ট্রগুলোর প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রস (আইসিআরসি), ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) এবং মেদসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ)।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৮৬ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার দশম বার্ষিকীতে সংস্থাগুলোর শীর্ষ নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এই প্রস্তাবের লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, বরং পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এক দশক আগে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও কর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবে সেই সহিংসতা থামেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেড়েছে। ফলে আজকের দিনটি কোনো অর্জনের নয়, বরং একটি ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিনই চিকিৎসাসেবার ওপর হামলার ভয়াবহ পরিণতি প্রত্যক্ষ করছেন মানবিক সংস্থাগুলোর কর্মীরা। হাসপাতাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে এবং অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আর চিকিৎসক, নার্স ও রোগীরা হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন বা আহত হচ্ছেন।

অনেক রোগী এমন আঘাতে মারা যাচ্ছেন, যা স্বাভাবিক অবস্থায় চিকিৎসাযোগ্য ছিল। অনেক নারী পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে পুরো সম্প্রদায় জীবনরক্ষাকারী সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যখন চিকিৎসাসেবা আর নিরাপদ থাকে না, তখন সেটি স্পষ্ট সংকেত দেয় যে যুদ্ধের ক্ষতি সীমিত করার জন্য নির্ধারিত নিয়ম ও মানদণ্ড ভেঙে পড়ছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন হামলার লক্ষ্যবস্তু হন, তখন তা শুধু মানবিক সংকট নয়, এটি মানবতারও চরম সংকট।

নেতারা জোর দিয়ে বলেন, সব রাষ্ট্র এবং সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এই আইনের অধীনে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব শুধু নিজেদের আচরণ সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং অন্যদেরও এই নিয়ম মানতে প্রভাব খাটানো।

জাতিসংঘ মহাসচিবের সুপারিশসমূহ, যা প্রস্তাব ২২৮৬-এর সঙ্গে যুক্ত, এখনও রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি কার্যকর কর্মপথ হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করেন তারা। আইসিআরসি, ডব্লিউএইচও এবং এমএসএফ তাদের উপস্থিতি, চিকিৎসা দক্ষতা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়।

এ ছাড়া ২০১২ সালে গৃহীত বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের প্রস্তাব ৬৫.২০-এর কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। যার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার ওপর হামলার তথ্য নিয়মিতভাবে নথিভুক্ত ও প্রতিবেদন করার ব্যবস্থা চালু হয়। এ ধরনের স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ প্রতিরোধ, প্রতিক্রিয়া এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাব ২২৮৬ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোর জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া, সশস্ত্র বাহিনীর নীতিমালায় চিকিৎসাসেবার সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয় আইন জোরদার করা। একইসঙ্গে পর্যাপ্ত অর্থ ও সম্পদ বরাদ্দ, সংঘাতে জড়িত অন্যান্য পক্ষকে প্রভাবিত করা, হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথাও বলা হয়েছে।

বিবৃতিতে আক্ষেপ করে বলা হয়, দশ বছর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুদ্ধের আইন মেনে চলা এবং আহত ও অসুস্থ মানুষসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু আজও হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং চিকিৎসাকর্মী ও রোগীরা হামলার শিকার হচ্ছেন। এটি আইনের ব্যর্থতা নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় অভাব।

বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, এই সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখাতে হবে। কারণ, যুদ্ধের শিকার কখনোই চিকিৎসাসেবা হতে পারে না।