
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার রশিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়ের শিক্ষক মো. কামরুল ইসলাম। পড়াশোনা করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে। অথচ, গত ১০ বছর ধরে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লার অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ২০২৬ সালের চলমান এসএসসি পরীক্ষায় ইংরেজি ১ম পত্রের প্রধান পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। খাতা মূল্যায়নের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পাবলিক পরীক্ষায় একজন আইসিটি শিক্ষকের নাম ইংরেজি বিষয়ের প্রধান পরীক্ষকের তালিকায় থাকায় শিক্ষক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
প্রাপ্ত নথিপত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের গত ১২ জানুয়ারির অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, যে শিক্ষক যে বিষয়ে পাঠদান করান শুধুমাত্র সে বিষয়েই অনলাইনে ইটিআইএফ প্যানেলে নির্বাচন করতে পারবেন। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী, অন্যথায় এটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
বোর্ড আরও জানায়, ইটিআইএফ পূরণে কোনো তথ্য গোপন বা অসত্য তথ্য সংযোজন করলে এর দায়-দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বহন করতে হবে। এসব কড়া নির্দেশনার পরও বোর্ডের ২০২৬ সালের ইংরেজি ১ম পত্রের প্রধান পরীক্ষকদের তালিকায় কামরুল ইসলামের নাম রয়েছে। অথচ, বিদ্যালয়ের হালনাগাদ পিডিএস ডেটাবেজ বলছে, মো. কামরুল ইসলাম মূলত আইসিটির সহকারী শিক্ষক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মো. কামরুল ইসলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক করেছেন এবং আইসিটি বিষয়ের ওপরে ৬ মাসের একটি শর্ট কোর্স করেছেন। তিনি আইসিটির পাশাপাশি নবম শ্রেণির ইংরেজি প্রথম পত্র পাঠদান করতেন। ইংরেজি ক্লাস করালে প্রাইভেট কোচিংয়ের জন্য শিক্ষার্থী পাওয়া যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে গত বছর দশম শ্রেণির ইংরেজি শিক্ষকের সাথে কথা বলে তিনি ইংরেজি ১ম পত্রের ক্লাস নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে শিক্ষক কামরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গত ১০ বছর ধরে তিনি পরীক্ষার্থীদের ইংরেজি খাতা দেখছেন এবং এবারে প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। স্কুলে ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় ইংরেজি পাঠদান করে আসছেন বলেও তিনি দাবি করেন। এখানে তার কোনো কারচুপি নেই এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবেদন করার পরই বোর্ড তাকে নির্বাচন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বোর্ড দায়িত্ব দিলে শিক্ষক হিসেবে তার কী করার আছে, এমন প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, তিনি অসুস্থ ডায়াবেটিসের রোগী, বোর্ড যদি এখন মনে করে তাকে বাদ দেবে, তাতেও তার কোনো সমস্যা নেই।
তথ্য বলছে, রশিদপুর স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তালিকায় রয়েছে বিদ্যুৎ সরকারের নাম। তিনি বিগত ৫ বছর এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। এর আগে ঢাকার একটি নন-এমপিওভুক্ত স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ইংরেজি বিষয়ের ওপরে স্নাতক শেষ করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে। তিনিও গত বছরে ইংরেজি ২য় পত্রের পরীক্ষক হিসেবে খাতা পেয়েছিলেন। তবে এই বছর আবেদন করলেও তিনি সুযোগ পাননি।
বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক তথ্য ফরম (ইটিআইএফ) প্যানেলে তথ্য এন্ট্রি ও চূড়ান্ত অনুমোদনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান প্রধানের। রশিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আমানত হোসেনের অনুমোদন ছাড়া এই তথ্য বোর্ডে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রশিদপুর স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আমানত হোসেন জানান, ইটিআইএফ প্যানেলে তথ্য প্রদানে কোনো অনিয়ম হয়নি। মো. কামরুল ইসলাম আইসিটি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হলেও তিনি ইংরেজি পাঠদান করেন এবং গত ১০ বছর ধরে তিনি ইংরেজি খাতার পরীক্ষক। সব স্কুলেই এক বিষয়ের শিক্ষক অন্যান্য বিষয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন বলে তিনি দাবি করেন।
একজন আইসিটি শিক্ষক ইংরেজি খাতা মূল্যায়ন করায় গত ১০ বছরে সোনাইমুড়ী উপজেলার হাজার হাজার শিক্ষার্থী মেধার সঠিক মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সাথে সোনাইমুড়ী উপজেলার বহু যোগ্য ও অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষকরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান, বোর্ড থেকে প্রাপ্ত সম্মানী ও ক্যারিয়ারের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা হলে সোনাইমুড়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জানান, সম্পূর্ণ বিষয়টি কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে। এই বিষয়ে কোনো অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বোর্ড কর্তৃপক্ষের। এর পরও তিনি প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে বিষয়টি খোঁজ নিবেন বলে আশ্বাস দেন।
কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর রুনা নাছরীনের মুঠোফোনে এ বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
পরবর্তীতে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. কবীর উদ্দিন আহম্মেদের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক তথ্য ফরম প্যানেলে তথ্য এন্ট্রির দায়িত্ব স্কুলের প্রতিষ্ঠান প্রধানের। এই বিষয়ে কোনো অনিয়ম হলে তার দায়ভার প্রধান শিক্ষকের। তারা যেভাবে তথ্য দিয়েছেন সেভাবেই শিক্ষকদের নাম এসেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নিবেন।
