
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সোনাইছড়ি এলাকায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মাজেদ এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাহাড় কেটে সেই মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে চলমান স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণকাজে। এ ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়নাধীন ‘সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় সাতকানিয়ার সোনাইছড়ি উপ–প্রকল্পে স্পিলওয়ে পুনর্নির্মাণ কাজ’ বাস্তবায়ন করছে মাজেদ এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্পটির প্যাকেজ নম্বর এসপি–২৫২৫৬ এবং টেন্ডার আইডি ১০৪০৯৪৩। সরকারি নথি অনুযায়ী, কাজটির চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৮৪ টাকা ৭৫ পয়সা।
নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি এবং শেষ হওয়ার কথা আগামী ২৯ মে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিয়ম না মেনে পার্শ্ববর্তী পাহাড় কেটে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি পরিবহন হলেও প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কীভাবে বিষয়টি দেখতে পাননি। তাদের দাবি, প্রকল্পটির কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দের যথাযথ নজরদারির অভাবের কারণেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমন কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সরকারি প্রকল্পের কাজে মাটি ভরাট ও পরিবহনের কাজ হয়েছে। তবে পাহাড় কেটে মাটি আনার মতো বিষয় প্রশাসনের নজরে না আসা কিংবা তদারকি কর্মকর্তাদের অজানা থাকাটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন বলেন, সোনাইছড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়ার বিষয়টি জেনে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছেন। ঠিকাদারদের লোকজন পাহাড় কাটা মাটি ট্রাকে করে কিছু মাটি তাদের কাজে ব্যবহার করেছে। এটার জন্য তিনি মাটি কাটার সাথে জড়িতদের বকাবকি করেছেন। তারা তাকে জানিয়েছেন, স্থানীয় লোকজন নাকি তাঁদেরকে ধসে পড়া মাটি এক্সকাভেটর দিয়ে সরিয়ে দিতে বলেছেন এবং এ জন্যই তারা এ কাজ করেছেন। বিষয়টি তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসানকে জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সবুজ কুমার দে বলেন, ঠিকাদার পার্শ্ববর্তী জমি থেকে মাটি নিতে পারবেন, কিন্তু পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এমনটি হয়ে থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, সরকারি বা বেসরকারি—কোনো প্রকল্পেই পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা যাবে না। পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। তাদের মতে, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকলে উন্নয়নের আড়ালে এমন পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা কখনো সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ও সাতকানিয়ার সীমান্ত এলাকায় বন বিভাগের উদ্যোগে একটি কৃত্রিম হ্রদের বাঁধ কেটে দেওয়ার ঘটনায় প্রায় ৮০০ একর জমির বোরো ও সবজি খেত পানিতে তলিয়ে যায়। ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু বসতবাড়ি এবং ভেঙে যায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সোনাইছড়ি খালের স্লুইসগেট। বর্তমানে সেই স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণের কাজই চলছে।
