ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্রতারণা ও আপনার করণীয়


ডিজিটাল ব্যাংকিং আমাদের জীবনকে নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সাইবার প্রতারণা। চট্টগ্রামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর ঘটনাটি এর একটি বাস্তব উদাহরণ। তিনি কেবল একটি ফ্রি রিচার্জের বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে অ্যাপ ডাউনলোড করেছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে তার ফোন হ্যাং হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ৪৮ হাজার টাকা গায়েব হয়ে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৯৫ শতাংশ ব্যাংকিং লেনদেন ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে। ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এই দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০০-র বেশি ব্যাংকিং সাইবার হামলার ঘটনা ঘটছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কারণে গত ৫ মে ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি জরুরি সতর্কতা বার্তা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, হ্যাকিং এবং ভুয়া অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা আর্থিক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

প্রতারকরা মূলত আবেগ, ভয় বা লোভ দেখিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। তারা ফিশিং লিংক পাঠিয়ে বা ম্যালওয়্যার যুক্ত ফ্রি অ্যাপ ডাউনলোড করিয়ে ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অনেক সময় তারা ভুয়া ব্যাংক কর্মকর্তা সেজে ফোন করে ভুল বুঝিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ওটিপি (OTP) বা পিন (PIN) সংগ্রহ করে। একবার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মাধ্যমে টাকা সরিয়ে ফেলে, যা পরে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

এই হ্যাকার ও প্রতারক চক্রের কারসাজি রোধে সরকারও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানিয়েছেন যে, সরকার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তা জোরদার করা, সন্দেহজনক লেনদেনে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা এবং অনলাইন প্রতারণায় জড়িত প্রায় ৫,০০০ এমএফএস অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা। এছাড়া বিটিআরসি প্রতারণামূলক অ্যাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করা হয়েছে।

আমাদের নিজেদেরও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ব্যাংক, বিকাশ বা কোনো সরকারি সংস্থা কখনো ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চায় না, তাই এটি কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না। অ্যাপ নামানোর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর ব্যবহার করতে হবে। যেকোনো লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক থাকতে হবে এবং সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক ফোন কেটে দিয়ে ব্যাংকের অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে।

যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন, তবে লজ্জায় চুপ না থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সাথে সাথে বিকাশ (১৬২৪৭) বা নগদের (১৬১৬৭) হেল্পলাইনে ফোন করে অ্যাকাউন্ট ব্লক করতে হবে এবং নিকটস্থ থানায় জিডি করতে হবে। এছাড়া সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা বাংলাদেশ ব্যাংকের হেল্পলাইনে (১৬২৩৬) অভিযোগ জানানো যেতে পারে। একটু সচেতনতা আর সতর্কতাই পারে আমাদের সারাজীবনের সঞ্চয় রক্ষা করতে।