
অদম্য পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কৃষি ও খামার ব্যবস্থাপনায় সফলতার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন পটিয়ার বারী এগ্রো ফার্মের উদ্যোক্তা বজলুল বারী চৌধুরী। খামারের বর্জ্য দিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে জৈব সার উৎপাদন করে তিনি চমক সৃষ্টি করেছেন। নিজের খামারে ব্যবহারের পাশাপাশি এই সার বাণিজ্যিকভাবেও উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
বুধবার এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ সারের নতুন মোড়ক উন্মোচন করেন পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহানুর রহমান। পটিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ কল্পনা রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সারের ব্যবহারের উপকারিতা তুলে ধরেন বারী এগ্রো ফার্মের কর্ণধার বজলুল বারী চৌধুরী।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এই জৈব সার তৈরিতে খামারের গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, কাঁচা শাকসবজির খোসা, সবুজ ঘাস, লতাপাতা, কচুরিপানা, শুকনো পাতা, ধানের খড়, তুষ, ডলোমাইট চুন, নিমের খৈল ও মেহগনি গাছের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত এ জৈব সার মাটির গুণগত মান ও গঠন উন্নত করে এবং বিষমুক্ত শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে সহায়তা করে।
জৈব সার উৎপাদনের পেছনের গল্প তুলে ধরে বজলুল বারী চৌধুরী জানান, ২০১০ সালে নিজেদের অনাবাদি জমিতে উন্নত জাতের ধান চাষের মাধ্যমে তার খামারের যাত্রা শুরু হয়। পরে পুকুরে মাছ চাষ এবং ময়মনসিংহ থেকে রেণু এনে পোনা উৎপাদন শুরু করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রায় দুই হাজার ডিমপাড়া মুরগির খামার গড়ে তোলেন। তবে ২০১৪-১৫ সালে মুরগির রোগে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে খামার বন্ধ করতে বাধ্য হন। পরে দুধেল গাভির খামার শুরু করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আবারও সংকটে পড়েন তিনি।
তিনি আরও জানান, পরে এলাকার অনাবাদি জমি ইজারা নিয়ে ভুট্টার চাষ শুরু করেন এবং গবাদিপশুর খাদ্যের জন্য সাইলেজ উৎপাদন করেন। পাশাপাশি সয়াবিন, পপকর্ন ও সুইট কর্ন চাষও করেন। উন্নত জাতের ধানের বীজ উৎপাদনের মাধ্যমেও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি।
খামারের সফলতা বৃদ্ধিতে উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও ডেইরি অফিসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে বজলুল বারী চৌধুরী বলেন, ২০১৯ সালে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের একটি প্রদর্শনী প্রদান করেন। পরে কৃষি কর্মকর্তা জুলফিকার আলীর সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট ও জৈব সার উৎপাদনের একটি মেশিন পান তিনি। এরপর বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও গ্যাস সরবরাহ করে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেন। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে উৎপন্ন বর্জ্য ব্যবহার করেই তিনি জৈব সার উৎপাদন শুরু করেন।
নিজ খামারের পাশাপাশি এলাকার ছোট ছোট গরুর খামার থেকেও গোবর সংগ্রহ করে বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার উৎপাদন করছেন তিনি। বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টন জৈব সার উৎপাদনে সক্ষম এই খামারের উৎপাদিত সার উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও ক্রয় করছে। বর্তমানে বারী এগ্রো ফার্মে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক নিয়মিত কর্মরত রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, এই খামার শুধু কৃষিতে নতুন সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, বরং কর্মস্থান ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পটিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ কল্পনা রহমান জানান, বারী এগ্রো ফার্ম শুরুতে নিজ উদ্যোগে জৈব সার উৎপাদন শুরু করলে কৃষি বিভাগের একটি প্রকল্প থেকে কিছু সহযোগিতা করা হয়। পরে তিনি নিজস্ব ভর্তুকি দিয়ে জৈব সার উৎপাদন বাড়ান। জৈব সার উৎপাদন বাড়লে রাসায়নিক সারের ওপর চাপ ও আমদানি কমবে।
তিনি আরও জানান, এই সার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী, কারণ এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং বেশি ফলন দেয়। তারা বারী এগ্রো ফার্মের কর্ণধার বজলুল বারী চৌধুরীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং সবসময় সহযোগিতা চাইলে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।
