মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন


রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মা-বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

বৃহস্পতিবার বিকালে নিজ এলাকা মিরসরাইয়ের ধুম ইউনিয়নের মহাজনহাট ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়।

জানাজায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার মরদেহ মিরসরাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জানাজা শেষে ধুম গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

বাবার স্মৃতিচারণ করে জানাজায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মেজ ছেলে ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব রহমান রুহেল বক্তব্য দেন।

মাহবুব রহমান রুহেল বলেন, আজ মিরসরাইবাসীর জন্য অনেক কষ্টের দিন। দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার পর আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি চট্টগ্রামের তথা মিরসরাইয়ের উন্নয়নের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। প্রায় একমাস ধরে তিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন থেকে মোট সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মিরসরাই আসন থেকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথম, তৃতীয়, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি মিরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতা এস রহমান ছিলেন তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী।

মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৬ সালে লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনেই তিনি ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান নেতা এম এ আজিজের হাত ধরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালে প্রথমবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে শুভপুর সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অভিযানে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ছিলেন মোশাররফ হোসেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় রাজনীতিতে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পিতা এস রহমানের প্রতিষ্ঠিত ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ এবং কক্সবাজারের ‘হোটেল সায়মন’ এর পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজেও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘গ্যাসমিন লিমিটেড’ এবং পরবর্তীতে ‘দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং’ হোটেলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় তার পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশের গুলিতে এবং ১৯৯২ সালে ফটিকছড়িতে হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন।

মৃত্যুকালে মহান স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এই জ্যেষ্ঠ নেতা স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।