চোরাই গরুর ভয়ে শঙ্কিত খামারিরা


ভোরের আলো ফোটার আগেই চকরিয়ার মাঠে নামেন খামারি আবদুল করিম। বছরের পর বছর ধরে এই একই রুটিন। গরুকে খাওয়ানো, গোসল করানো, যত্ন নেওয়া। এই পশুগুলো তাঁর কাছে শুধু সম্পদ নয়, সারা বছরের পরিশ্রম আর পরিবারের স্বপ্নের প্রতীক। কোরবানির ঈদ আসে মানে তাঁর মতো হাজারো খামারির বুকে একসঙ্গে জমা হয় আশা আর উৎকণ্ঠা।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এখন সেই মৌসুম এসে গেছে। রাস্তায় গরুর পাল, হাটে ক্রেতার ভিড়, মহাসড়কের পাশে অস্থায়ী পশুর বাজারের তোড়জোড়। ঈদুল আজহার আগমনী বাতাসে চকরিয়ার মাঠ-ঘাট এখন এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর।

চারণভূমির গরু, আলাদা তার কদর

চকরিয়ার মাটি ও প্রকৃতি গবাদি পশু পালনের জন্য বরাবরই উপযুক্ত। বিস্তীর্ণ চারণভূমি, সবুজ ঘাসের মাঠ আর প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা গরু-মহিষের আলাদা একটা গুণ আছে, যা ক্রেতারা চেনেন, বোঝেন।

চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার মোহাম্মদ আরিফ উদ্দিন বলছিলেন সেই কথাই। তাঁর ভাষায়, এখানে প্রাকৃতিকভাবে পশু হৃষ্টপুষ্ট হয়। তাই দক্ষিণ চট্টগ্রামের মধ্যে চকরিয়ার গরু-মহিষের আলাদা কদর রয়েছে। শুধু কথার কথা নয়, সংখ্যাই বলছে সত্যি। উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় গরুর এক হাজার একশটি, মহিষের একশ বিশটি, ছাগলের সাড়ে চারশো এবং ভেড়ার পঁচাশিটি খামার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

এই খামারগুলো থেকে এবার কোরবানির হাটে তোলার জন্য প্রস্তুত হয়েছে মোট ৪৩ হাজার ৫৭৬টি পশু। এর মধ্যে গরু ২৫ হাজার ৮১০টি, মহিষ ১ হাজার ৭৪৫টি, আর ছাগল ও ভেড়া ১৬ হাজার ১১টি। উপজেলায় এবার কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা প্রায় ৪২ হাজার। অর্থাৎ বাইরে থেকে একটি গরুও না আনলেও চকরিয়ার স্থানীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি হাজারো পরিবারের এক বছরের রক্ত-ঘামের হিসাব।

হাটে হাটে উৎসবের রঙ

উপজেলার ২২টি সরকারি হাটবাজারে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পশু কেনাবেচা। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, হাটের জমাট ততই বাড়ছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একের পর এক বসছে অস্থায়ী পশুর হাট।

হাটে গেলে চোখে পড়ে এক জীবন্ত ছবি। বাঁশের খুঁটিতে দড়িতে বাঁধা গরু। পাশে খামারি বসে আছেন পান চিবুতে চিবুতে। ক্রেতা এলে উঠে পড়েন, গরুর পিঠে হাত বুলিয়ে গুণ বলতে শুরু করেন। ক্রেতা গরুর পেছন-পাশ দেখেন, দাঁত দেখেন, পেট টিপে দেখেন। দরদাম হয়। কখনো মিলে, কখনো মেলে না।

সরেজমিনে কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবারও ক্রেতারা দেশীয় জাতের গরুর দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। বিদেশি বা চোরাই পথে আসা গরুর চেয়ে দেশীয় গরুর মাংস বেশি সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা। এই বিশ্বাসই চকরিয়ার খামারিদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।

চোরাই গরুর ভয়, খামারির দুশ্চিন্তা

কিন্তু এত আশার মাঝেও একটা কাঁটা বিঁধে আছে খামারিদের বুকে। বছরের পর বছর ধরে একটি চক্র চোরাপথে মিয়ানমার থেকে গরু নিয়ে আসে এবং স্থানীয় হাটে বিক্রি করে। এই বার্মাইয়া গরু বাজারে ঢুকলে দাম পড়ে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হন দেশীয় খামারিরা।

শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আনা এসব পশুকে পথে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। সেই ভ্যাকসিনের প্রভাবে মাংস ঠিকমতো সিদ্ধ হয় না। অনেকে এই মাংস খেয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ ক্রেতাও ঠকছেন, খামারিও মার খাচ্ছেন। লাভবান হচ্ছে শুধু ওই চক্রটি।

তবে এবার কিছুটা স্বস্তির খবর আছে। মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় চলমান অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও সংঘাতের কারণে এই মুহূর্তে পশু চোরাচালান বন্ধ আছে। এটি একটি ঘটনাচক্রের সুফল, তবুও খামারিরা নিশ্চিন্ত নন। কারণ পরিস্থিতি বদলালেই চক্রটি সক্রিয় হয়ে যায়। তাই প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা।

পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন

প্রাণিসম্পদ অফিসার আরিফ উদ্দিন বলছিলেন, খামারি ও গৃহস্থালির মানুষজন এবার হাটে পশু তুলতে রীতিমতো মুখিয়ে আছেন। এই মুখিয়ে থাকার পেছনে আছে বহু মাসের পরিশ্রম, অনেক রাতের জাগরণ, আর পরিবারের প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন।

একজন খামারির জন্য কোরবানির ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি তাঁর বার্ষিক হিসাব-নিকাশের দিন। সারা বছরের খরচ উঠবে কি না, আগামী বছরের পুঁজি জমবে কি না, সব উত্তর মেলে এই কয়টি দিনে।

চকরিয়ার মাঠে এখন যে গরুগুলো চরছে, সেগুলোর পেছনে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের রোজকার গল্প। সেই গল্পগুলো সুখের হোক, এই ঈদে খামারির মুখে হাসি ফুটুক, আর ক্রেতা পান সুস্থ-সতেজ দেশীয় পশু, এটুকুই প্রত্যাশা চকরিয়ার লক্ষ মানুষের।