চাকরি ছেড়ে স্বপ্নের পথে, ৬ লাখ থেকে কোটির খামার


মাস্টার্স পাস করার পর অনেকেই যে পথে হাঁটেন, শহীদুলও সেই পথেই পা বাড়িয়েছিলেন। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজ। কিন্তু মনের ভেতরে একটা অস্থিরতা ছিল। অন্য কিছু একটা করার তাড়না। নির্ধারিত সময়ে অফিসে ঢোকা আর বের হওয়ার এই চক্রে তিনি নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলেন না।

একদিন সব ছেড়ে দিলেন।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাথুয়া গ্রামের শহীদুল ইসলাম ইবন আজ কোনো অফিসে যান না। প্রতিদিন সকালে তিনি যান তাঁর নিজের খামারে। যেখানে প্রায় ৮০টি গরু আছে, ছয়জন কর্মচারী আছেন, আর আছে একটি স্বপ্নের বাস্তব রূপ।

শুরুটা ছিল সাহসের গল্প

২০২২ সাল। পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেছেন শহীদুল। হাতে ডিগ্রি, সামনে অনিশ্চয়তা। কিন্তু মামা হাজী মুহাম্মদ এহছানুল হকের একটি পরামর্শ বদলে দিল সব।

মামা বললেন, খামার করো। শহীদুল রাজি হলেন। মামার কাছ থেকেই ধার নিলেন প্রয়োজনীয় টাকা। মাত্র ৬ লাখ টাকা পুঁজি আর ৪টি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান গাভী নিয়ে শুরু হলো ‘মেসার্স এহসান এগ্রো ফার্ম লিমিটেড’-এর যাত্রা।

শুরুটা সহজ ছিল না। শহীদুল নিজেই স্বীকার করেন সে কথা। গরুর পরিচর্যা শেখা, খাবার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই সামলানো, বাজার বোঝা। একজন মাস্টার্স পাস তরুণের জন্য এই জগৎ ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। প্রতিটি বাধাকে পাঠ হিসেবে নিয়েছেন।

তিন বছরে যে রূপান্তর

সেই ৪টি গাভী আজ ৮০টি গরুতে পরিণত হয়েছে। ৬ লাখের পুঁজি এখন কোটি টাকার সম্পদ। খামারে চলছে একই সঙ্গে দুগ্ধ উৎপাদন ও গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম। বাথুয়া গ্রামে ‘এহসান এগ্রো ফার্ম’ এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।

শহীদুল এখন শুধু একজন খামারি নন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ছয়জন মানুষের সংসার চলছে তাঁর খামারকে কেন্দ্র করে। যে তরুণ একদিন চাকরির খোঁজে ঘুরতেন, আজ তিনি নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করছেন।

কোরবানির ঈদে খামার এখন জমজমাট

ঈদুল আজহা এগিয়ে আসছে। শহীদুলের খামারে এখন অর্ধশতাধিক বিভিন্ন জাতের গরু প্রস্তুত। দাম শুরু ৮০ হাজার থেকে, সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে শুধু কোরবানির মৌসুমে নয়, সারা বছরই তাঁর খামার থেকে গরু কেনার সুযোগ রয়েছে।

শহীদুল জানালেন, এলাকার মানুষ থেকে শুরু করে শহরের ক্রেতারাও আসছেন খামারে। কোরবানির বাজারে বিদেশি বা চোরাই পথে আসা গরুর বদলে স্থানীয় খামারের সুস্থ-সতেজ গরুর দিকে ক্রেতাদের ঝোঁক বাড়ছে। এটি তাঁর মতো খামারিদের জন্য বড় সুযোগ।

স্বাধীনতার স্বাদ চাকরিতে নেই

শহীদুলের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, চাকরি ছেড়ে কোনো আফসোস হয় কি না। হাসতে হাসতে বললেন, চাকরির চেয়ে ব্যবসায় স্বাধীনতা অনেক বেশি। এখন নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে পারছি, এই অনুভূতির সঙ্গে কিছুর তুলনা হয় না।

পটিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছও শহীদুলের এই যাত্রাকে অনুপ্রেরণামূলক বলেই মনে করেন। তাঁর মতে, শিক্ষিত তরুণরা যখন খামারে আসছেন, তখন এই খাতে আধুনিকতা আসছে, পেশাদারিত্ব আসছে। এটি দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সত্যিকারের সুসংবাদ।

তরুণদের উদ্দেশে এক বার্তা

শহীদুল এখন শুধু নিজের স্বপ্ন দেখেন না, তাঁর চারপাশের তরুণদেরও স্বপ্ন দেখান। তাঁর কথা সরল, চাকরির পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হোন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এই কথাটুকু বলার অধিকার তাঁর আছে। কারণ তিনি কেবল উপদেশ দেননি, নিজে করে দেখিয়েছেন। মাত্র তিন বছরে ৬ লাখ টাকার পুঁজিকে কোটি টাকার উদ্যোগে রূপ দেওয়া কোনো রূপকথা নয়, এটি পরিশ্রম, সাহস আর বিশ্বাসের গল্প।

বাথুয়া গ্রামের সেই খামারটি এখন শুধু গরুর বাড়ি নয়, এটি একটি প্রমাণ যে সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক সময়ে নেওয়া গেলে জীবন অনেকটাই বদলে যায়।