
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর নুরুল হোসেনের কথা মনে আছে? যিনি ৯০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৪০ সপ্তাহে শোধ দিচ্ছেন এক লাখ দুই হাজার। যার স্ত্রীর গয়না বন্ধক রাখতে হয়েছে ঘুষের টাকা জোগাতে। যিনি প্রতিদিন সকালে অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামেন, মাথায় কিস্তির হিসাব ঘুরতে থাকে- এক মুহূর্তের জন্যও থামে না।
গত ৬ মে একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ধনীর জন্য ছাড়, গরিবের জন্য ঋণ‘ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল এই বাস্তবতা- ধনী আমদানিকারকেরা পাচ্ছেন ৮৯ থেকে ৩৭ শতাংশে কর-ছাড়ের সুবিধা, আর নুরুল হোসেনের মতো প্রান্তিক চালকেরা গুনছেন ২৪ শতাংশ সুদ, দিচ্ছেন ঘুষ।
সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পাঁচ দিনের মাথায় ১১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করল একটি নতুন সার্কুলার। বিষয়: বাণিজ্যিকভাবে ‘ই-ঋণ’ প্রচলন।
যা বলছে সার্কুলার
ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় জারি হওয়া এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে- দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এখন থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র ঋণ দিতে পারবে। শাখায় যেতে হবে না, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে না, কোনো কাগজে সই দিতে হবে না।
মোবাইল অ্যাপ বা ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবেদন করলেই মিলবে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা। মেয়াদ এক বছর। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শর্তটি- বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এই ঋণের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ।
২৪ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ- ব্যবধানটা শুধু সংখ্যার নয়, এটা জীবনের।
যাদের কথা বলছিল প্রতিবেদন
গত ৬ মে-র প্রতিবেদনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চার ডজনের বেশি ইভি চালকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের প্রায় সবাই বলেছিলেন, দৈনিক আয়ের প্রায় অর্ধেক চলে যায় কিস্তি শোধ করতে। বাকিটা ভাগ হয় ব্যাটারি চার্জ আর পরিবারের পেট চালানোর মধ্যে।
প্রচলিত ব্যাংক এঁদের ঋণ দেয় না। যোগ্যতাই হয় না। ফলে এনজিওই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র ভরসা- আর সেই ভরসার দাম চোকাতে হয় চড়া সুদে, কখনো ঘুষে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলারে বলা হয়েছে, যাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে- তাঁরাই এই ই-ঋণের আবেদন করতে পারবেন। বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে: “ক্রেডিট কার্ডের জন্য চাকরির প্রমাণ লাগে, অনেক কাগজপত্র লাগে। কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেই এই ঋণ মিলবে- প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ীরাও এটা পেতে পারেন।”
ছোট্ট টাকা, বড় স্বস্তি
মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন মনে করিয়ে দিলেন, “৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনলেও তা কোরবানিতে বিক্রি করে দেওয়া যায়। এই ৫০ হাজার টাকা শুধু ঋণ নয়- এটা পুঁজিতে সাপোর্ট।”
নুরুল হোসেনের হিসাবে মেলাই। ৯০ হাজার টাকা এনজিও থেকে নিয়ে তাঁকে শোধ দিতে হচ্ছে এক লাখ দুই হাজার। অর্থাৎ সুদ-বাবদ গেছে ১২ হাজার টাকা, তার ওপর ঘুষ তো আলাদা।
৫০ হাজার টাকা ই-ঋণে বছরে ৯ শতাংশ সুদ হলে গুনতে হতো সাড়ে চার হাজার টাকা। কোনো ঘুষ নেই, কোনো লাইন নেই, কোনো কর্মকর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না।
তবু যে প্রশ্ন থাকে
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে প্রশ্নও আছে।
ফাহিম মাশরুর বলছেন, ৯ শতাংশ সুদের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে ব্যাংকগুলো এই ছোট ঋণে আগ্রহী নাও হতে পারে। “এটা সিকিউরিটি ছাড়া ঋণ। ১০০ জনকে দিলে যদি ২০-২৫ জন ফেরত না দেয়, ব্যাংকের লোকসান হবে। রিস্ক কভার করতে সুদের হার একটু বেশি থাকা দরকার।”
আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, এই ঋণ পেতে হলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে- অথচ চট্টগ্রামের যে চালকদের সঙ্গে কথা হয়েছিল, তাঁদের অনেকেরই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। সেই সংযুক্তির কাজটি এখনো বাকি।
চট্টগ্রামের ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের জেলা আহ্বায়ক আল কাদেরী জয়ের দাবি এখনো একটাই: “এনজিওর বদলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।”
সেই দাবির দিকেই যেন একটু হলেও এগিয়েছে রাষ্ট্র।
পাঁচ দিনের দূরত্ব
৬ মে প্রতিবেদন, ১১ মে সার্কুলার- পাঁচ দিনের এই ব্যবধানে কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করা সাংবাদিকতার নিয়মে সহজ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ, বহু সংস্থার পরামর্শে এগোয়।
তবে সংযোগটুকু অন্তত এটুকু- যে বাস্তবতার কথা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেছিল, সার্কুলারটি ঠিক সেই ফাঁকটাই পূরণ করতে চাইছে।
এখন দেখার বিষয়, কাগজের নির্দেশনা বাঁশখালীর মাটি পর্যন্ত পৌঁছায় কি না। নুরুল হোসেন প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হন। কিস্তির হিসাব মাথায় নিয়ে।
তাঁর মাথা হালকা হওয়ার দিনটির জন্য অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
