গ্রামের আলো নেভাবে কি পিডিবির হিসাব?


পঞ্চাশ বছর ধরে একটি কাজ করে আসছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে আলো পৌঁছে দেওয়া। যেখানে রাস্তা নেই, যেখানে বাজার নেই, সেখানেও বিদ্যুতের তার টেনে নিয়ে গেছে আরইবি। আজ দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৭৭ শতাংশ, প্রায় সাড়ে তিন কোটি গ্রাহক এই সংস্থার ছাতার নিচে।

কিন্তু সেই আলো এখন হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, যা কার্যকর হলে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের পঞ্চাশ বছরের কাঠামোটাই ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হবে রাষ্ট্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

ক্রস সাবসিডির সেতু, যা গ্রামকে বাঁচিয়ে রেখেছে

আরইবির গল্পটা বোঝার জন্য একটু পেছনে যেতে হবে। দেশজুড়ে ৮০টি সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সংস্থাটি। এই ৮০টি সমিতির সবগুলো একরকম নয়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলঘেঁষা ২১টি সমিতিতে গ্রাহক বেশি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি, তাই আয়ও বেশি। গত অর্থবছরে মাত্র ১৩টি সমিতি প্রকৃত মুনাফা করেছে।

আর বাকি ৬৫টি সমিতি? সেগুলো চলে কীভাবে?

চলে সেই লাভজনক সমিতিগুলোর আয় থেকে। গত অর্থবছরে ১৩টি মুনাফাকারী সমিতি থেকে ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বাকি ৬৫টি সমিতিকে। এই ব্যবস্থাটির নাম ‘ক্রস সাবসিডি’। যারা বেশি আয় করে, তারা কম আয়ের সমিতিকে টিকিয়ে রাখে। এটাই ভারসাম্যের সেতু, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে গ্রামীণ বিদ্যুতের পুরো কাঠামো।

পিডিবির প্রস্তাব, সেতুতে কুঠারাঘাত

পিডিবি এখন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যা সেই সেতুতেই কুঠারাঘাত করতে পারে।

প্রস্তাবের মূল কথা হলো, আরইবির ২১টি লাভজনক সমিতির জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হোক। যুক্তি হিসেবে পিডিবি বলছে, এই সমিতিগুলোর গ্রাহক কাঠামো ঢাকার ডেসকো বা ডিপিডিসির মতো। তাই তাদের কাছ থেকে শহরের দামে পাইকারি বিক্রি করাই ন্যায্য।

সংখ্যায় বোঝা যাক। বর্তমানে আরইবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনছে ৬ টাকা ২৪ পয়সায়। খুচরায় বিক্রি করছে সাড়ে আট টাকায়। পিডিবির চোখে এই ব্যবধানটাই সমস্যা। অন্যদিকে ডেসকো কেনে ৮ টাকা ৫৮ পয়সায়, বিক্রি করে ১০ টাকা ৪০ পয়সায়। পিডিবি চাইছে আরইবির সমৃদ্ধ সমিতিগুলোকেও ডেসকোর কাতারে আনতে।

কিন্তু সেটা হলে কী ঘটবে?

লাভজনক সমিতিগুলোর কেনার দাম বাড়বে, মুনাফা কমবে। আর সেই মুনাফাই যেহেতু বাকি ৬৫টি লোকসানি সমিতিকে বাঁচিয়ে রাখছে, সেই ভর্তুকির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট সমিতিগুলো কীভাবে টিকবে?

লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের দায় গ্রামের মানুষের কাঁধে

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম একটি কথাই বললেন, পিডিবি নিজেদের লুণ্ঠনমূলক ব্যয়ের দায় সবার ওপর চাপাচ্ছে।

এই ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ কোথা থেকে আসছে? পিডিবি নিজেই জানাচ্ছে, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের জন্য মাসে গড়ে ১২ ডলার, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ২৫ ডলার পর্যন্ত শুধু কেন্দ্র ভাড়া দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ভাড়া যাচ্ছে। এই অপরিকল্পিত ব্যয়ের সুবিধাভোগীরা হাত গুটিয়ে বসে আছেন, আর দায় বর্তাচ্ছে গ্রামের কম আয়ের মানুষের ওপর।

পিডিবির হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের আর্থিক ঘাটতির ৬৩ শতাংশই হয়েছে আরইবিকে কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার কারণে। কিন্তু এই যুক্তিটি উল্টো করে দেখলে প্রশ্ন জাগে, গত পাঁচ দশকে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়ে রাষ্ট্র যে সুফল পেয়েছে, কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, শিল্প ছড়িয়েছে, জীবনমান উন্নত হয়েছে, সেই হিসাব কি পিডিবির খাতায় আছে?

৩ কোটি ৭০ লাখ গ্রাহকের ভবিষ্যৎ

আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের মোট গ্রাহকের ৫৬ শতাংশের বিদ্যুৎ যায় আবাসিক খাতে। এই আবাসিক গ্রাহকদের বেশির ভাগই কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী দরিদ্র মানুষ। লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের এই গ্রাহকদের কম দামে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে লোকসান গুনতে হয়।

এদিকে আরইবি নিজেও বিইআরসিতে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। চলতি বছর তা বেড়ে ২ হাজার ৩৬৮ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। তারা চাইছে খুচরায় দাম অন্তত ৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়াতে।

অর্থাৎ একদিকে পিডিবি চাইছে আরইবির পাইকারি দাম বাড়াতে, অন্যদিকে আরইবি চাইছে গ্রাহকের কাছে খুচরা দাম বাড়াতে। দুই দিক থেকেই চাপ আসছে সেই একই মানুষের দিকে, যিনি গ্রামের মাটিতে বাস করেন।

গণশুনানি, তারপর কী?

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলছেন, ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে অংশীজনদের নিয়ে পিডিবির প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করা হবে। ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

এই আশ্বাসটুকুই এখন ভরসা। কিন্তু বাংলাদেশে ‘ভোক্তার স্বার্থ’ আর ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’-এর মাঝখানে কতটা দূরত্ব থাকে, তা সবারই জানা।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পিডিবির প্রস্তাব মানা হলে গ্রামীণ বিদ্যুতের ক্রস সাবসিডির ভারসাম্য ভেঙে পড়বে। লোকসানি সমিতিগুলো টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ হয় বেশি দামে বিদ্যুৎ পাবেন, নয়তো পাবেনই না।

পঞ্চাশ বছর আগে যে আলো গ্রামে পৌঁছেছিল, পিডিবির একটি প্রস্তাবই তা নিভিয়ে দিতে পারে। শুধু সংখ্যার হিসাব মেলাতে গিয়ে।