
কোরবানির হাট। ঈদের আগের সপ্তাহে যেখানে লক্ষ লক্ষ টাকার গরু-ছাগল কেনাবেচা হয়। যেখানে প্রতিটি পশু বিক্রিতে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা কয়েকশো টাকা হাসিল। সেই হাটের ইজারা মিলছে মাত্র ২৪৬ টাকায়।
না, এটি ছাপার ভুল নয়। দুই শত ছেচল্লিশ টাকা।
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রশাসনের ২০২৬ সালের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে এমন অবিশ্বাস্য তথ্যই মিলেছে। যে হাটে একটি মাত্র গরু বিক্রি হলেই সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা পাঁচশো থেকে সাতশো টাকা, সেই হাটের পুরো মৌসুমের ইজারা দেওয়া হচ্ছে তারও কম দামে।
কাগজে যা লেখা আছে
উপজেলা প্রশাসন এবারের ঈদুল আজহায় ২২টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করেছে। তার মধ্যে সাতটি হাটের সরকারি মূল্য তিন অঙ্কের ভেতরেই আটকে আছে।
সোনাপুর বাজার সংলগ্ন হাটের সর্বনিম্ন সরকারি দর ধরা হয়েছে ২৪৬ টাকা। আমিন বাজার ইদগাহ সংলগ্ন হাট, ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা সংলগ্ন হাট এবং মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটের সরকারি দর ৩৫২ টাকা। সাহারপাড় হনুফা বাজার সংলগ্ন হাটের দর ৫২২ টাকা। কালিকাপুর বাজার সংলগ্ন হাট ৬০৩ টাকা। শান্তির হাটের দর ৬০৬ টাকা।
এই হাটগুলোতে অংশ নিতে দরপত্র ক্রয়ের অফেরতযোগ্য সিডিউলের মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ কোনো কোনো হাটে ইজারার দরপত্রের কাগজের দামই হাটের সরকারি মূল্যের দ্বিগুণ।
আইন কী বলে, বাস্তব কী দেখাচ্ছে
সরকারি বিধিমালা বলছে ভিন্ন কথা। ‘হাট ও বাজার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ অনুযায়ী, বিগত তিন বছরের প্রাপ্ত গড় মূল্যের সঙ্গে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করে হাটের চূড়ান্ত সরকারি দর নির্ধারণ করতে হয়।
কিন্তু বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই নিয়ম মানা হয়নি। বরং কিছু হাটের দর গত বছরের তুলনায় উল্টো কমে গেছে।
মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটের উদাহরণটি সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। গত বছর এই হাটের সরকারি দর ছিল ১ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ২ হাজার ২০ টাকা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হিসাব করলে এই বছর সর্বনিম্ন দর হওয়ার কথা ৭১৩ টাকা ৭৩ পয়সা। অথচ এবার সরকারি দর ধরা হয়েছে মাত্র ৩৫২ টাকা।
একইভাবে ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা সংলগ্ন হাটে গত বছর সরকারি দর ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা, সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ২ হাজার ২০ টাকা। এবার সেই হাটের দর নির্ধারিত হয়েছে মাত্র ৩৫২ টাকায়।
গত বছরের চেয়ে দর বেড়েছে এমন হাটও আছে। বটতলি বাজারের হাটে গত বছর সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ৩ হাজার ১০ টাকা। এবার সরকারি দর ১ হাজার ৩ টাকা।

হাট চলেছে, রাজস্ব আসেনি
সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। কাগজে লেখা আছে মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটে বিগত দুই বছর কোনো খাস আদায় হয়নি। সেই কারণেই নাকি এবার দর কমানো হয়েছে।
কিন্তু স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কবির হোসেন খোকন স্বীকার করছেন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হাট পরিচালনা হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা হাট চালিয়েছেন।
স্থানীয় এক সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করে জানালেন আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। আওয়ামী লীগের সময়ে দলীয় নেতাকর্মীরা হাট পরিচালনা করেছেন, হাসিলও আদায় হয়েছে। কিন্তু সরকারি কাগজে তা ওঠেনি।
অর্থাৎ হাটে কোটি টাকার পশু বেচাকেনা হয়েছে, হাসিল আদায় হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা সরকারি কোষাগারে যায়নি। আর সেই অনিয়মের সুবাদেই এখন সরকারি খাতায় হাটটি আয়শূন্য দেখাচ্ছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী দর কমে গেছে।
সিস্টেমটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। লুটপাট করো, কাগজে শূন্য দেখাও, তারপর সেই শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে আরও সস্তায় ইজারা নাও।
দায়িত্বশীলরা কী বলছেন
হাট-বাজার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বললেন, মূল্য উপর থেকে নির্ধারণ হয়ে আসে। বিস্তারিত জানতে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলুন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আকতার বললেন, বিগত তিন বছরের গড় হিসাব করেই দর নির্ধারণ হয়েছে। ইজারা না হলে খাস আদায় করা হয়।
কিন্তু যখন প্রশ্ন করা হলো, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হাট পরিচালনা হলেও সরকারি খাতায় আয় শূন্য কেন, তখন তিনি বললেন, সেসময় আমি ছিলাম না, জানি না।
উপজেলা পরিষদের অফিস সহকারী মামুনও একই উত্তর দিলেন। সেই সময় তিনি এই উপজেলায় ছিলেন না।
কেউ ছিলেন না, কেউ জানেন না। কিন্তু টাকা গেছে কারো না কারো পকেটে।
রাষ্ট্রের ক্ষতি কতটুকু
সরকারি টোল চার্ট অনুযায়ী একটি গরু বিক্রিতে সরকারি কোষাগারে আসার কথা পাঁচশো থেকে সাতশো টাকা। কোরবানির হাটে শত শত গরু বিক্রি হয়। একটি মাঝারি হাটে কয়েক লাখ টাকার রাজস্ব আসার কথা।
অথচ সেই হাটের পুরো মৌসুমের ইজারা যাচ্ছে ২৪৬ থেকে ৬০৬ টাকায়। বাকি লাখ লাখ টাকা কোথায় যাচ্ছে, কার পকেটে যাচ্ছে, সেই হিসাব কেউ দিচ্ছেন না।
এটি শুধু সোনাইমুড়ীর সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুটপাটের একটি পরিচিত কৌশলের নমুনা। যে কৌশলে কাগজ ঠিক থাকে, নিয়ম মেনে স্বাক্ষর হয়, কিন্তু টাকা চলে যায় অন্য পথে।
সিন্ডিকেটের খেলা, অসাধু কর্মকর্তার ছায়া
হাট-বাজার ইজারার এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সচেতন মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, যে হাটে একটি গরুর দাম লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, সেই গরুর হাসিলই আদায় হয় কয়েক হাজার টাকা। অথচ সেই হাটের পুরো মৌসুমের ইজারামূল্য একটি গরুর হাসিলের চেয়েও কম। এই হিসাব কোনো স্বাভাবিক নিয়মে মেলে না।
সচেতন মহলের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় স্বার্থান্বেষী মহল হাট ইজারায় সিন্ডিকেট তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। কৌশলটা পরিচিত। আগে থেকে প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত করো, কম দামে ইজারা নাও, তারপর হাট থেকে মোটা আয় করো। এই চক্র বছরের পর বছর চলতে থাকলে রাষ্ট্রের কোষাগার শূন্য হয়, আর সিন্ডিকেটের পকেট ভারী হয়।
আর এই সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কারা? সচেতন মহলের সরাসরি অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা নানা অজুহাতে সুবিধার বিনিময়ে এই সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দিচ্ছেন। অস্বাভাবিক কম দরে ইজারামূল্য নির্ধারণ, বছরের পর বছর খাস আদায়ের নামে নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশ্নের মুখে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি, সবকিছু মিলিয়ে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী ব্যবস্থা টিকে আছে। যার মাশুল দিচ্ছে রাষ্ট্র, ভোগ করছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ।
ঈদ আসছে। হাট বসবে। গরু বিকবে। হাসিল উঠবে।
কিন্তু সেই টাকা রাষ্ট্রের ঘরে যাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছেন না।
