‘ধর্ষকের বিচার চাই না, লাশ চাই’


বিকেলের রোদ তখনো পুরোপুরি মেলায়নি। চট্টগ্রামের বাকলিয়ার চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোড তখন স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু বিসমিল্লাহ ম্যানশনের ভেতর থেকে একটি খবর বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বাভাবিকতা ভেঙে পড়ে। তিন বছরের একটি মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অভিযুক্ত এলাকারই যুবক মো. মনির।

মুহূর্তের মধ্যে জড়ো হন শত শত মানুষ। ক্রোধ, কান্না আর অবিশ্বাস মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয় সেখানে।

আটক, তারপর তালা

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা মনিরকে ধরে ফেলেন। পুলিশের জন্য অপেক্ষা না করে তাঁরা তাঁকে কাছের একটি মাদ্রাসার গেটে তালাবদ্ধ করে রাখেন। উদ্দেশ্য একটাই- এবার যেন সে পার না পায়।

পুলিশ এলে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জনতার দাবি, অভিযুক্তকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। একজন উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, “ধর্ষককে আমাদের হাতে দেন, আমরা মেরে ফেলব। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষকের বিচার হয় না।”

কথাটা শুধু একজনের ছিল না। ভিড়ের ভেতর থেকে বারবার একই সুর উঠে আসছিল।

বিচারের প্রতি অবিশ্বাসই আসল আগুন

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ একজন বাসিন্দা পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনারা নিলেই ছাড়েন। বিচার হয় না। তাকে আমাদের হাতে দেন।”

আবুল ফজল নামের আরেকজন বললেন, “এমন ঘটনার বিচার দেশে ঠিকমতো হয় না। শাস্তি পায় না অপরাধীরা।”

এই কথাগুলো কেবল রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। এর পেছনে আছে বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা হতাশা। ধর্ষণের মামলা হয়, তদন্ত হয়, মাঝে মধ্যে সাজাও হয়। কিন্তু বিচার যে হয় না- এই বিশ্বাসটা মানুষের মনে শিকড় গেড়ে বসেছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সেই শিকড় থেকেই উঠে এলো ক্রোধের আগুন।

ধাওয়া, পাল্টাধাওয়া, সাউন্ড গ্রেনেড

পুলিশ অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে যেতে চাইলে জনতা গাড়ি ঘিরে ধরে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় আশপাশের রাস্তায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব মোতায়েন করা হয়। মাইকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়- “বিচার আইনের মাধ্যমে হবে, কেউ আইন হাতে তুলে নেবেন না।”

কিন্তু জনতা সহজে সরেননি। শেষ পর্যন্ত সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়।

শঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু

যে শিশুকে ঘিরে এত উত্তাপ, সে তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা শঙ্কাজনক। তিন বছরের একটি শিশু- যে এখনো পৃথিবীটা চেনে না ঠিকমতো, সে কী বুঝবে তার সঙ্গে কী হয়েছে।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোলাইমান বলেন, “আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনতার আবেগকে সম্মান করি, কিন্তু তারা যেন আইন নিজের হাতে না নেয়।”

পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার হোসাইন কবির ভূঁইয়া বলেন, “ক্ষুব্ধ জনতা কিছুতেই অভিযুক্তকে নিয়ে যেতে দিচ্ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়তে হয়েছে।”

বাকলিয়ার সেই বিকেলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু যে প্রশ্নটা জনতার মুখ থেকে বারবার বেরিয়ে এসেছে- বিচার কি আসলে হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো সাউন্ড গ্রেনেডে মেলে না।