
ঈদুল আজহা আসছে। রান্নাঘরে আদার চাহিদা বাড়ছে। আর ঠিক এই মুহূর্তে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে আদার দাম যেন রকেটের গতিতে উড়ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে বেড়ে গেছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। যে আদা সপ্তাহ আগেও পাইকারিতে ছিল ১০০ থেকে ১১০ টাকা, সেটাই এখন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। খুচরায় ২০০ থেকে ২২০ টাকা।
দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে এই মুহূর্তে চরম অস্থিরতা। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা, সবাই হতভম্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাম বাড়ার পেছনে কি সত্যিই সরবরাহ সংকট, নাকি আছে সিন্ডিকেটের কারসাজি?
ব্যবসায়ীরা বলছেন, লোকসানের কারণে আমদানিকারকরা নতুন করে এলসি খুলতে অনাগ্রহী। তাই সরবরাহ ঘাটতি, তাই দাম বেড়েছে।
কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টমসের পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে।
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে শুধু আদাই আমদানি হয়েছে ৬২ হাজার ৩৯৪ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ হাজার ৫৪৭ টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ২৩ হাজার ৮৪৭ টন বেশি আদা আমদানি হয়েছে।
আমদানি বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। তবু বাজারে সংকট। তবু দাম আকাশছোঁয়া।
এই দুইয়ের মাঝখানে যে ফাঁকটুকু, সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল প্রশ্ন। আমদানি করা হাজার হাজার টন আদা গেল কোথায়? কার গুদামে জমা আছে? কোন সিন্ডিকেটের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে?
খুচরা বিক্রেতা সাকিব হিসাব মেলাতে পারছেন না। মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিন আগে ৯৫ টাকা কেজিতে কয়েক বস্তা আদা কিনেছিলেন। সেই বস্তা এখনও পুরো শেষ হয়নি। কিন্তু শনিবার নতুন মাল কিনতে বাজারে গিয়ে দাম দেখে ফিরে আসতে হয়েছে খালি হাতে।
ক্রেতাদের অবস্থা আরও করুণ। মুরাদপুরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, রমজান আসলে দাম বাড়ে, কোরবানির ঈদ আসলে দাম বাড়ে। প্রতিবার নতুন অজুহাত, প্রতিবার একই ফল। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা বেরিয়ে যায়, কিন্তু দায়ী কেউ হয় না।
খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলছেন, গত কয়েক মাস আদার দাম নিম্নমুখী ছিল। আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। লোকসান দিতে দিতে অনেক আমদানিকারক পুঁজি হারিয়েছেন। তাই নতুন এলসি খোলেননি। ঈদের আগে সরবরাহ ঘাটতি পড়ায় বাজার অস্থিতিশীল হয়েছে।
শুনতে যুক্তিসংগত মনে হলেও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন এই যুক্তিকে বলছেন ঠুনকো অজুহাত।
তাঁর কথায়, দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের সবসময় একটি অজুহাত দরকার হয়। এলসি সংকট হলো এবারের নতুন বাহানা। কোরবানির ঈদে আদার চাহিদা বাড়ে, ঠিক তখনই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সারা বছর স্বাভাবিক ব্যবসার বদলে উৎসবের মৌসুমে এককালীন বিশাল মুনাফা লুটে নেওয়াই এদের লক্ষ্য।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার ও প্রশাসন সাধারণ ভোক্তাদের চেয়ে গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষায় বেশি তৎপর। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
শুধু আদা নয়, খাতুনগঞ্জে অন্যান্য মসলার বাজারও ওঠানামা করছে। চীনা রসুন পাইকারিতে ১১০ থেকে ১১২ টাকা, দেশি রসুন ৪০ থেকে ৬০ টাকা, পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৩৫ টাকা প্রতি কেজি। কোরবানির রান্নায় এই মসলাগুলোর চাহিদা একসঙ্গে বাড়ে। আর ঠিক সেই সুযোগেই প্রতিটি পণ্যে চাপ তৈরি হচ্ছে।
আমদানি বেড়েছে, তবু দাম বেড়েছে। গুদামে মাল আছে, তবু বাজারে সংকট। এই সমীকরণ মিলতে চায় না।
কোরবানির ঈদ একটি নির্দিষ্ট সময়ের উৎসব। প্রতি বছর একই সময়ে আসে। তবু প্রতি বছরই একই ঘটনা ঘটে। আদা, পেঁয়াজ, রসুনের দাম হঠাৎ লাফিয়ে ওঠে। তদন্ত হয়, কথা হয়, তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। পরের বছর আবার একই গল্প।
সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে, বাজার তদারকিতে কঠোর না হলে, এই গল্প বদলাবে না। কোরবানির হাড়িতে রান্না হবে, সেই রান্নায় আদা পড়বে, আর সেই আদার দাম থেকে যাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
