
এক দশক আগে কোরবানির ঈদ এলেই চট্টগ্রামের পশুর হাটগুলোতে একই দৃশ্য- কাদায় মাখামাখি পা, দরকষাকষির চিৎকার, মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট। পরিবার নিয়ে হাটে যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না। সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আধুনিক অ্যাগ্রো ফার্মের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে দাঁড়িয়ে পছন্দের গরুটি বেছে নিচ্ছেন ক্রেতারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে আগে থেকেই বুকিং দিচ্ছেন অনেকে। হাটের ধুলো-কাদা আর নেই, আছে বায়োসিকিউরিটি প্রোটোকল আর সেন্সরভিত্তিক ওজন-ট্র্যাকিং।
চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর বাজারে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে।
ঈদের আগেই শেষ
ঈদুল আজহার এখনও আট দিন বাকি। অথচ চট্টগ্রামের বড় খামারগুলোর ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পশু ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। সংখ্যাটি ছোট নয়, এটি একটি বড় পরিবর্তনের সংকেত।
নাহার ক্যাটল ফার্মের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এবারের মৌসুমে আমরা প্রায় ৪০০টি পশু প্রস্তুত করেছি। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। মানুষ আগেভাগেই খামারে এসে পশু দেখে বুকিং করে রাখছেন।”
এশিয়ান অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক আলিফ চৌধুরীর অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাদের ২৫০টি পশুর মধ্যে ঈদের আগেই ৬০ শতাংশ চলে গেছে। শাহীওয়াল, হোলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, ব্রহ্মা আর অ্যাঙ্গাসের মতো প্রিমিয়াম জাতের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুই সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হচ্ছে।
দাম কিছুটা বেড়েছে। পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার দেড় লাখ থেকে ১৫ লাখ পর্যন্ত গরু বিক্রি হচ্ছে। কিছু খামার ৫০ হাজার টাকায়ও পশু দিচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য বলছে, এবার চট্টগ্রামে পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৮১টি। স্থানীয়ভাবে আসছে প্রায় ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি। বাকি প্রায় ৩৫ হাজার পশু আসবে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে।
হাট নয়, খামারই এখন পছন্দ
ক্রেতারা কেন হাট ছেড়ে খামারে যাচ্ছেন? উত্তরটা সহজ— স্বাচ্ছন্দ্য, স্বচ্ছতা এবং পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
এশিয়ান অ্যাগ্রো থেকে গরু কেনা মো. হাছান বলেন, “হাটে যাওয়া অনেক ঝামেলার। কাদা, ভিড় আর বর্জ্যের কারণে পরিবার নিয়ে যাওয়াই সম্ভব হয় না। তাই এবার খামারে এলাম।”
আরেক ক্রেতা মো. রফিক বলেন, “খামারে সময় নিয়ে পশু দেখা যায়, যাচাই করা যায়, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। হাটে এই সুযোগ নেই।”
অনেক খামার এখন প্রি-বুকিং চালু করেছে। সামান্য অগ্রিম দিয়ে পশু বুক করে রাখা যায়। ঈদের আগ পর্যন্ত সেটি খামারেই থাকে। বাড়িতে পশু রাখার ঝামেলা নেই।
কর্পোরেট থেকে ডিজিটাল
২০১৫ সালের পর থেকে চট্টগ্রামের গবাদিপশু খাত আস্তে আস্তে শখের খামার থেকে কর্পোরেট অ্যাগ্রো এন্টারপ্রাইজে রূপ নিচ্ছে। সাবেক কর্পোরেট পেশাজীবীরা এখন খামার পরিচালনায় নেমেছেন। পশুর জন্য আলাদা খাদ্য পরিকল্পনা, বায়োসিকিউরিটি প্রোটোকল, সেন্সরভিত্তিক ওজন ও খাদ্য গ্রহণের ট্র্যাকিং— সবই হচ্ছে এখন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল মার্কেটিং। গরুর নাম দেওয়া হচ্ছে, ভিডিও তৈরি হচ্ছে, ফেসবুকে লাইভ বিক্রি হচ্ছে। কিছু গরু রীতিমতো অনলাইন সেলিব্রিটি বনে যাচ্ছে। কোভিড মহামারির পর এই প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।
গবাদিপশু এখন শুধু প্রাণী নয়, এটি একটি ব্র্যান্ডেড পণ্য।
ছোট খামারিরা কোথায়?
এই রূপান্তরের আলোর পাশে আছে আঁধারও। দেড় বছর আগেও চট্টগ্রামে প্রায় ১২ হাজার ৫০০টি খামার ছিল। পশুখাদ্যের ক্রমবর্ধমান দাম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি আর বাজারের অস্থিরতায় অনেক ছোট খামারি পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এই খাত এখন বড় এবং শক্তিশালী খামারগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত জাত, প্রযুক্তি এবং ভালো প্রাণিচিকিৎসা সেবার কারণে এই শিল্প দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্ত ভিত্তি পাচ্ছে। চট্টগ্রাম ক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিসম্পদ হাব হিসেবে গড়ে উঠছে।
ঐতিহ্যবাহী হাটের আবেদন পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে বাজারের মূল স্রোত এখন আধুনিক খামারের দিকেই বইছে। কাদার হাট থেকে ক্লিন ফার্ম- চট্টগ্রামের কোরবানির পশুর বাজার এভাবেই নতুন রূপ নিচ্ছে।
