হান্টা ভাইরাসের উৎস, প্রাদুর্ভাব এবং বাংলাদেশের করণীয়


বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ঠিক সেই সময় নতুন করে আলোচনায় এসেছে হান্টা ভাইরাস (Hantavirus)। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাধিক দেশে হান্টা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে আটলান্টিক মহাসাগরে একটি আন্তর্জাতিক ক্রুজ জাহাজে আন্দিজ স্ট্রেইনের (Andes strain) হান্টা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বলছে, সাধারণ জনগণের জন্য ঝুঁকি এখনো কম, তবুও ভাইরাসটির সীমিত মানব-থেকে-মানব সংক্রমণের ক্ষমতা এবং উচ্চ মৃত্যুহার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

হান্টা ভাইরাস কী এবং এর ধরন

হান্টা ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। এর মূল বাহক হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর ও দন্তজাতীয় প্রাণী। আক্রান্ত ইঁদুরের প্রস্রাব, মল ও লালার মাধ্যমে ভাইরাস পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ সাধারণত দূষিত ধূলিকণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হয়।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, হান্টা ভাইরাসের প্রধান দুটি ধরন রয়েছে। প্রথমটি হলো Hemorrhagic Fever with Renal Syndrome (HFRS), যা এশিয়া ও ইউরোপে বেশি দেখা যায় এবং কিডনিকে আক্রান্ত করে। দ্বিতীয়টি হলো Hantavirus Cardiopulmonary Syndrome (HCPS), যা আমেরিকা অঞ্চলে বেশি দেখা যায় এবং ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমান আলোচিত “Andes virus” হলো একমাত্র পরিচিত হান্টা ভাইরাস, যা সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণের উপায়

২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, “MV Hondius” নামের একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজে হান্টা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। WHO নিশ্চিত করেছে যে একাধিক যাত্রী Andes virus-এ আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। WHO-এর Disease Outbreak News অনুযায়ী, আক্রান্ত যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজনের উপসর্গ ছিল গুরুতর শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কন্টাক্ট ট্রেসিং শুরু হয়।

রয়টার্স এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের ৪২ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যদিও হান্টা ভাইরাস কোভিড-১৯ এর মতো সহজে সংক্রমিত হয় না।

এই ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ইঁদুরের মল বা প্রস্রাব শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে, দূষিত খাদ্য গ্রহণ করলে, ইঁদুর কামড়ালে এবং দূষিত স্থানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে ছড়ায়। Andes virus-এর ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ মানবিক সংস্পর্শে এটি ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঘর, গুদাম, শস্যভান্ডার বা অপরিচ্ছন্ন স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এক্ষেত্রে ইঁদুর প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে।

লক্ষণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী প্রতিরোধ

হান্টা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে সাধারণত জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বা বমিভাব, পেটে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। গুরুতর অবস্থায় ফুসফুসে পানি জমা, কিডনি বিকল হওয়া, রক্তক্ষরণ, শক বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, HCPS-এর মৃত্যুহার ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত হতে পারে।

প্রতিরোধের জন্য ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র জানিয়েছে। এজন্য ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে, খাদ্য ঢেকে রাখতে হবে এবং আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে ইঁদুরের মল বা প্রস্রাব শুকনো অবস্থায় ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে না। এতে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বরং জীবাণুনাশক বা পানি দিয়ে ভিজিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়াও মাস্ক ব্যবহার, গ্লাভস পরা এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সতর্কতা হিসেবে হাসপাতালগুলোকে মানসম্মত সতর্কতা অনুসরণ করতে হবে এবং দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনের ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি এবং আমাদের করণীয়

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের হান্টা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দেশের উচ্চ জনঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ইঁদুরের আধিক্য ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে বস্তি, খাদ্য গুদাম, ধান ও শস্য সংরক্ষণাগার, অপরিচ্ছন্ন বাজার, প্লাবিত এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা ও অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় ইঁদুরের আবাসস্থল পরিবর্তিত হচ্ছে, যা মানুষের সংস্পর্শ বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের এখন থেকেই কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হান্টা ভাইরাস সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ-এই তিন খাতকে সমন্বয় করে ওয়ান হেলথ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যার ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুরুত্ব দিয়েছে।

তৃতীয়ত, সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকারকে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইঁদুরের বিস্তার কমানো যায়। চতুর্থত, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ইউনিট, পিপিই সরবরাহ এবং দ্রুত ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, বাংলাদেশে ইঁদুরবাহিত রোগ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। তাই ইঁদুরের মধ্যে ভাইরাস শনাক্তকরণ এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, হান্টা ভাইরাস এখনো বৈশ্বিক মহামারির পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভাইরাসটি মূলত ইঁদুরবাহিত হলেও কিছু ক্ষেত্রে সীমিত মানব-থেকে-মানবে সংক্রমণ ঘটতে পারে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এখন থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি নিশ্চিত করা জরুরি। সময়মতো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।