
কোনো অভিযোগের ঘটনায় জনগণ যদি অভিযুক্তকে নিজেরা ধরে শাস্তি দিতে চায়, সেটাকে ‘মব জাস্টিস’ বা ‘নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়া’ বলে। বাংলাদেশের আইনে এটি সরাসরি অপরাধ। ইসলামী শরিয়াহ আইনও এই বিষয়টিকে সমর্থন করে না। এ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং ইসলাম কী বলে, তা নিয়েই আজকের এই নিবন্ধ লেখার প্রয়াস।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩৫ প্রত্যেক নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দিয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্র ছাড়া কারও শাস্তি দেওয়ার অধিকারও এই সংবিধানে নেই।
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় গত ২১ মে চার বছরের এক শিশু ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এতে ওই এলাকার মানুষ ধর্ষণে অভিযুক্তকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিচার করার ঘোষণা দেয়। এ ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রচুর সম্পদ ভাঙচুর করে। আহত হন স্থানীয় মানুষ, পুলিশ, সাংবাদিকসহ নানা পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ।
পুরো ঘটনাটির প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি জনগণের আইন না জানা। সাধারণ মানুষ জানে না, অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষক হলেও তাকে মারধর করা, হত্যা করা বা পিটিয়ে জখম করা সম্পূর্ণভাবে খুন ও মারধরের অপরাধ। “সে অপরাধী”—শুধু এই সন্দেহে নিজে বিচার করতে গেলে যেকোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের আইনে আসামি হয়ে যাবেন।
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ বলছে, অপরাধের তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিচার করার ক্ষমতা শুধু পুলিশ এবং আদালতের। সাধারণ নাগরিক কেবল জামিন অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে পারেন। ধারা ৪৩ অনুযায়ী নাগরিক গ্রেপ্তার করতে পারলেও, তাকে অবিলম্বে থানায় হস্তান্তর করতে হবে। নিজে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বহুবার বলেছে, মব জাস্টিস রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি। ২০১৯ সালে নুসরাত হত্যা ও গণপিটুনির ঘটনায় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করে বলেছে, “আইন নিজের হাতে তুলে নিলে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে”। ২০১৩ সালে “শিমুল-সাগর” গণপিটুনি মামলায় আদালত ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা মানেই তা প্রমাণ নয়। সঠিক তদন্ত, ডিএনএ, ফরেনসিক ও সাক্ষী ছাড়া দেশের প্রচলিত আইনে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে গণরোষে নিরপরাধ মানুষ মারা গেছেন। মানুষ যখন নিজে বিচার করে, তখন আদালত ও পুলিশ অচল হয়ে যায়।
আইন সুযোগ দিচ্ছে এবং বলছে কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশকে জানানো যায়। ভিকটিমকে সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ে গিয়ে মেডিকেল রিপোর্ট করা জরুরি। কারণ শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে মেডিকেল রিপোর্ট ও ডিএনএ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ৯ অনুযায়ী মামলা করা যায়। এই আইনে শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। দ্রুত বিচারের প্রয়োজনে রাষ্ট্রপক্ষের মাধ্যমে স্পিডি ট্রায়ালের আবেদন করা যায়।
রাষ্ট্রের আইনে অভিযোগ যতই গুরুতর হোক না কেন, শাস্তি দেওয়ার একমাত্র কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র ও আদালত। জনগণ শুধু অপরাধীকে ধরে পুলিশে দিতে পারে; নিজে মারধর বা হত্যা করতে পারে না।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ অনুযায়ী শিশু ধর্ষণের শাস্তি খুবই কঠোর। ২০২০ সালের সংশোধনীর পর এই শাস্তি আরও কঠোর করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৯(১)-এ উল্লেখ রয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তাঁর শাস্তি হবে ‘মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ এবং অর্থদণ্ড। ২০০০ সালের মূল আইনে শাস্তি ছিল শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ২০২০ সালের অর্ডিন্যান্স ও সংশোধনীর পর এতে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত হয়েছে।
এই আইনের ধারা ৯(৩): দলবদ্ধ ধর্ষণ ও মৃত্যু/আঘাত। যদি একাধিক ব্যক্তি মিলে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং সেই কারণে ওই নারী/শিশু মারা যায় বা আহত হয়, তাহলে প্রত্যেক আসামির শাস্তি হবে ‘মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ এবং অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা।
এই আইনের ধারা ৯(২) অনুযায়ী যদি ধর্ষণ বা ধর্ষণের পরবর্তী কোনো কাজের ফলে ভিকটিমের মৃত্যু হয়, তাহলে আসামির শাস্তি হবে ‘মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’ এবং অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা।
ধারা ৯(৪) অনুযায়ী ধর্ষণের চেষ্টা করলে শাস্তি ৫ থেকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানা। ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা বা আঘাত করলে শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানা।
এই আইনের মামলার বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হয়। মামলা দায়েরের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা আছে। তদন্ত ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হয়। এসব অপরাধ দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া জামিন অযোগ্য। ভিকটিমের পরিচয় গোপন রাখা বাধ্যতামূলক এবং মিডিয়ায় নাম-ছবি প্রকাশ নিষিদ্ধ। এই আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশুর ক্ষেত্রে ‘সম্মতি আমলযোগ্য বিষয় নয়’। এই বয়সের শিশুর সাথে যৌনমিলন হলেই তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে।
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় যে চার বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই হবে। কিন্তু এই শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের। জনগণ আইন নিজ হাতে তুলে নিলে তারা নিজেরাই খুন বা মারধরের মামলায় আসামি হবে।
এতক্ষণ আলোচনা হলো দেশের প্রচলিত আইন কী বলছে তা নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ধর্ষণের ক্ষেত্রে শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ চেয়েছেন। তাহলে শরিয়াহ আইনের প্রয়োগ বা ইসলামী বিচারব্যবস্থার স্বরূপ কেমন, তা নিয়ে কুরআন ও হাদিস কী বলছে, এবার তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
ইসলামে বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। আর ইনসাফের পূর্বশর্ত হলো সত্য উদ্ঘাটন। এ কারণেই ইসলামে সাক্ষ্যপ্রমাণের মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর। এই কঠোরতার একমাত্র মাকসাদ (উদ্দেশ্য) হলো, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ঘুণাক্ষরেও অবিচারের শিকার না হন।
ইসলামে সাক্ষ্যপ্রমাণের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। কুরআনে বারবার সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সততা ও নির্ভুলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সূরা নিসায় (আয়াত: ১৩৫) আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতা অথবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও। সে বিত্তশালী হোক বা দরিদ্র হোক, আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং সুবিচারে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা সত্য এড়িয়ে যাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা কর সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’
সূরা নিসায় (আয়াত: ৫৯) আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের অনুগত হও এবং তোমাদের জন্য যারা বিচারক তাদের; অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে কোন মতবিরোধ হয় তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাক; এটাই কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি।’
আল্লাহর রাসুলও (সা.) সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছেন। হাদিসে এসেছে, তিনি বললেন: ‘তোমাদের কি আমি সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলব? তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, মা-বাবার অবাধ্যতা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ তিনি এই কথা বলার সময় হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিলেন, কিন্তু সোজা হয়ে বসে গেলেন এবং বারবার এটি পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৫৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭)
বুখারি শরিফের ৬৯৬৭ নম্বর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘আমি তো একজন মানুষ মাত্র। আর তোমরা আমার কাছে বিবাদের মীমাংসার জন্য এসে থাক। হতে পারে তোমাদের কেউ নিজের পক্ষে অন্যজনের চেয়ে বেশি সুন্দর ও সাবলীলভাবে দলিল উপস্থাপন করতে পারে এবং আমি তার কথা শুনে তার পক্ষেই রায় দিয়ে দিই। তবে সাবধান! আমি যদি কারো ভাইয়ের অধিকারের কোনো অংশ (ভুলবশত) তাকে দিয়ে দিই, সে যেন তা গ্রহণ না করে। কারণ, আমি তাকে বস্তুত আগুনের একটি টুকরো কেটে দিচ্ছি।’
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিচারক মানুষ হওয়ায় ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাই সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব কেবল শুনে নেওয়া নয়, বরং বিচার হলো পুনঃযাচাইয়ের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করা।
অনেকে মনে করেন শরিয়াহ কোর্টে বিচার মানে চাটাইয়ে বসে মৌখিক সাক্ষ্য নিয়ে তাৎক্ষণিক ফায়সালা করে ফেলা। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। সৌদি আরবসহ শরিয়াহনির্ভর আদালতগুলো শরিয়াহর মূলনীতি বজায় রেখেই আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে থাকে।
বিচারের আগে তারা বিস্তারিত তদন্ত করে। ডিএনএ টেস্ট, ফরেনসিক মেডিসিন, ডিজিটাল ফরেনসিকসহ সব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক মাস লেগে যায়। বিচার পর্যায়ে সাক্ষ্যপ্রমাণের জরাহ-তাদিল (যাচাই-বাছাই) হয়, আসামি ও সাক্ষীর জেরা-পুনঃজেরা হয়। প্রয়োজনে একাধিক তারিখ পড়ে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কখনো কখনো বছরও পার হয়ে যায়।
এর কারণ স্পষ্ট। কুরআনের সূরা হুজুরাতে (আয়াত: ৬) আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোন কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ ধর্ষণের মতো যেকোনো গুরুতর অপরাধে আধুনিক ফরেনসিক ও ডিএনএ টেস্ট এই যাচাইয়েরই উন্নত রূপ। ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়; বরং সত্য উদ্ঘাটনে যা সহায়ক, তার সবই গ্রহণযোগ্য।
প্রাক-আধুনিক যুগে সমাজ ছিল ছোট, পারস্পরিক পরিচয় ছিল ঘনিষ্ঠ। তখন মৌখিক সাক্ষ্য যাচাই করা তুলনামূলক সহজ ছিল। প্রযুক্তি সীমিত হওয়ায় বিচারও দ্রুত সম্পন্ন হতো। শুধু শরিয়াহ কোর্টে নয়, তখন পৃথিবীর সব সভ্যতায় বিচার দ্রুত হতো। কিন্তু সমাজ জটিল হওয়ার সঙ্গে অপরাধের ধরনও জটিল হয়েছে। তাই প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতিও উন্নত হয়েছে।
ইসলাম কখনো বলে না যে বিচার তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হবে। বরং ন্যায়ের জন্য সময় লাগলে সেটাই শরিয়তসম্মত।
সূরা মায়েদায় (আয়াত: ৮) আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোন কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’
সম্প্রতি চট্টগ্রামে চার বছরের শিশু ও ঢাকায় রামিসা ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মানুষ নিজ হাতে আইন তুলে নিতে চেয়েছে। এটি ইসলাম ও রাষ্ট্রব্যবস্থা—উভয়ের দৃষ্টিতেই নিষিদ্ধ।
আল্লাহ কুরআনে সূরা মায়েদায় (আয়াত: ৭৭) বলেন, ‘বল, হে কিতাবধারীগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করো না, আর সেই সম্প্রদায়ের খেয়াল খুশির অনুসরণ করো না যারা ইতোপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে আর সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।’
আবু দাউদ শরিফের স্পষ্ট হাদিস (হাদিস নম্বর: ৩৫৮৮) থেকে জানা যায়, আবদুল্লাহ ইবনুয যুবায়ের (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ‘বাদীর দায়িত্ব হলো প্রমাণ পেশ করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হলো শপথ করা। সেই সাথে বাদী ও বিবাদী উভয়কেই বিচারকের সামনে (সমানভাবে) বসতে হবে।’
অপরাধ যত জঘন্যই হোক না কেন, শাস্তি দেওয়ার অধিকার কেবল রাষ্ট্রের বিচারকের। ব্যক্তি যদি নিজ হাতে শাস্তি দিতে শুরু করে, তাহলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং বহু নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়।
ইসলামী বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো নিরপরাধকে রক্ষা করা এবং অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া। এ জন্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মানদণ্ড কঠোর, যাচাই-বাছাই পুঙ্খানুপুঙ্খ। সৌদি আরবসহ আধুনিক শরিয়াহ আদালতগুলো এই মাকসাদকে সামনে রেখেই ডিএনএ, ফরেনসিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বিচার দ্রুত হওয়া বা দেরি হওয়া শরিয়ত বা বেশরিয়তের মানদণ্ড নয়। মানদণ্ড হলো নিখুঁত তদন্ত ও ইনসাফ। তাই অপরাধের খবরে উত্তেজিত না হয়ে আমাদের উচিত আইনের পথে থাকা, প্রমাণের অপেক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখা। এটাই কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং সমাজের স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক সহসভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।
