
কোরবানির ঈদ আসছে। সারাদেশে লাখ লাখ গরু-ছাগল কোরবানি হবে। তার চামড়া সংগ্রহ করবে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা, এতিমখানার কর্মীরা, আর হাজারো দরিদ্র মানুষ। ঈদের পরের দিন ভোরে রাস্তায় নামবেন তারা, হাতে বস্তা, চোখে আশা। বছরের একটি দিনে যে আয় তাদের কয়েক মাস চালাতে পারত।
কিন্তু এবার সেই আশা কতটুকু?
সরকার ঘোষণা করেছে, লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম হবে প্রতি পিস ১ হাজার ৩৫০ টাকা। গত বছরের চেয়ে ৫ টাকা বেশি। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গত বছর সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩৪৫ টাকা। কিন্তু বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কোথাও কোথাও মানুষ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। যে চামড়ার জন্য পরিশ্রম করেছেন, লবণ কিনেছেন, রোদে শুকিয়েছেন, সেই চামড়া নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না।
এ বছরও একই গল্প হবে কি?
একটি সংখ্যা, একটি শিল্পের মৃত্যু
২০১৫ সালে একটি গরুর চামড়ার দাম ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। মুদ্রাস্ফীতি হিসাবে ধরলে সেই দাম এখন হওয়ার কথা প্রায় ৪ হাজার ১৮০ টাকা। অর্থাৎ যদি চামড়ার মূল্য অন্যান্য পণ্যের মতো স্বাভাবিক হারে বাড়ত, তাহলে আজ প্রতি পিস চামড়া বিক্রি হতো চার হাজার টাকার কাছাকাছি।
কিন্তু বাস্তবে ২০২৬ সালে চামড়া বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়।
মূল্য পতন ৮০ শতাংশের বেশি।
চাল, ডাল, তেল, মাংস, পরিবহন, বিদ্যুৎ সবকিছুর দাম বেড়েছে। এমনকি চামড়া সংরক্ষণের লবণের দামও বেড়েছে। কিন্তু চামড়ার দাম কমেছে। শুধু কমেনি, ধসে পড়েছে। একটি শিল্প এভাবে মারা যায়, নীরবে, ধীরে ধীরে, সবার চোখের সামনে।
যে শিল্প একসময় গর্ব ছিল
চামড়া খাত একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস ছিল। এখন সেই খাত সংকুচিত হয়ে মোট রপ্তানির মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশে ঠেকেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে চামড়া ও ফুটওয়্যার রপ্তানি ছিল মাত্র ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
এক দশকে রপ্তানি কমেছে ৬৪ শতাংশ।
বৈশ্বিক চামড়া বাজারের আকার ৪২০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সেখানে ধরে রাখতে পারছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ বৈশ্বিক কাঁচা চামড়ার চাহিদার প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ সরবরাহ করে বাংলাদেশ।
মানে কাঁচামাল আছে, কিন্তু সেটাকে মূল্য সংযোজন করে বিক্রি করার সক্ষমতা নেই।
তিনটি ব্যর্থতা, একটি মৃত্যু
প্রথম ব্যর্থতা: সাভারের স্বপ্ন, বাস্তবের দুঃস্বপ্ন।
২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া হলো সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে। বলা হলো, পরিবেশ রক্ষা হবে, আন্তর্জাতিক মানের সনদ পাওয়া যাবে, রপ্তানি বাড়বে।
নয় বছর পরেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি চালু হয়নি। প্রতিদিন মাত্র ১৪ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিশোধন করতে পারে, অথচ কোরবানির মৌসুমে দরকার ৩৫ হাজার ঘনমিটার।
ফলাফল? দেশের ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র ৬ থেকে ১০টি আন্তর্জাতিক চামড়া কার্যকরী গোষ্ঠীর (এলডব্লিউজি) সনদ পেয়েছে। ভারতে ১৩৯টি, চীনে ১০৩টি, ভিয়েতনামে ১৪টি ট্যানারি সনদপ্রাপ্ত।
এই সনদ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের বড় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনবে না। চামড়া পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি সৈয়দ নাসিম মনজুরের ভাষায়, “এই সনদ ছাড়া আমরা বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে অদৃশ্য।”
সনদবিহীন চামড়া বিক্রি হয় প্রতি বর্গফুট শূন্য দশমিক ৮০ থেকে ১ ডলারে। সনদপ্রাপ্ত চামড়া বিক্রি হয় ১ দশমিক ৮০ থেকে ২ দশমিক ৫০ ডলারে। পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণ। পোল্যান্ডের একটি ট্যানারি এলডব্লিউজি গোল্ড সার্টিফিকেট পাওয়ার পর তাদের চামড়ার দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ।
কিন্তু বাংলাদেশ সেই দরজাই খুলতে পারছে না।
দ্বিতীয় ব্যর্থতা: রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ কারাগার।
যখন দেশীয় ট্যানারিগুলো ন্যায্য দামে চামড়া কিনতে পারছে না, তখন বিকল্প পথ হতে পারত কাঁচা বা আধা প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি। কিন্তু বছরের পর বছর সেই পথ বন্ধ রাখা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে কলকাতার বন্দরে কাঁচা গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি কেজি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা। ঢাকার আড়তে একই সময়ে দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা। অর্ধেক।
শ্রীলঙ্কা ২০২৫ সালে অস্থায়ীভাবে কাঁচা চামড়া রপ্তানি খুলে দিলে মাত্র দুই সপ্তাহে প্রতি কেজির দাম বেড়ে যায় ৪৫ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে কোরবানির মৌসুমে যখন বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া একসঙ্গে বাজারে আসে, দাম মেঝেতে আছড়ে পড়ে।
২০১৯ থেকে ২০২১ সালে অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছিলেন।
তৃতীয় ব্যর্থতা: সরকারি দামের কাগজি বাস্তবতা।
প্রতি বছর ঈদের আগে সরকার দাম ঘোষণা করে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, এবার ভালো দাম মিলবে। কিন্তু মাঠে গেলে সেই দামের কোনো অস্তিত্ব নেই।
গত বছর সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩৪৫ টাকা। বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৯০০ টাকায়। এই ব্যবধান বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। মূল্য পর্যবেক্ষণ নেই, জবাবদিহির কাঠামো নেই। আড়তদাররা নিজেদের মতো দাম দেয়, আর চামড়া বিক্রেতারা অসহায় হয়ে মেনে নেয়।
যে মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের
গত তিন বছরে শুধু অযত্নে নষ্ট হওয়া চামড়া থেকে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছর চামড়া পচেই নষ্ট হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা।
অথচ সাভারের বর্জ্য শোধনাগার মেরামত ও আপগ্রেড করতে চাওয়া হয়েছে ৮০০ কোটি টাকা। মানে দুই বছরের নষ্ট হওয়া চামড়ার টাকা দিয়েই সেই শোধনাগার ঠিক করা যেত।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া খাতে কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এই টাকা আদায় করতে পারলে শোধনাগার মেরামতের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ জোগাড় হতো।
কিন্তু কেউ সেই হিসাব করছে না।
মাদরাসার ছাত্ররা যে স্বপ্ন হারাচ্ছে
ঈদুল আজহার পর মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করে। সেই চামড়া বিক্রি করে যে টাকা আসত, তা দিয়ে কয়েক মাসের খরচ চলত। শিক্ষকদের বেতন, খাবার, বিদ্যুৎ বিল, বই কেনা, সংস্কার।
কিন্তু এখন মোট চামড়ার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ মাদরাসা ও এতিমখানার চাহিদা মেটাতে পারছে। বাকিটা কোথায় যাচ্ছে? কম দামে বিক্রি হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে, কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে।
একসময় একটি মাদরাসা কোরবানির চামড়া থেকে পেত দুই-তিন লাখ টাকা। এখন পায় বিশ-ত্রিশ হাজার। সেই টাকা দিয়ে কী হয়?
একটি প্রজন্ম স্বপ্ন দেখত, চামড়া সংগ্রহ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখবে। এখন সেই স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে।
যে পথ এখনো খোলা আছে
ভিয়েতনাম মাত্র এক দশকে নাইকি, পুমা, অ্যাডিডাসের মতো ব্র্যান্ডের প্রধান সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের শিয়ালকোট ট্যানারি জোনে বর্জ্য শোধনাগার চালু হওয়ার মাত্র ১৮ মাসে আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির হার ৭ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশে এপেক্স ফুটওয়্যার এলডব্লিউজি গোল্ড সনদ নিয়ে নাইকি ও অ্যাডিডাসের কাছে সরাসরি রপ্তানি করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু চামড়ার জুতা রপ্তানি থেকে এসেছে ৬৭২ মিলিয়ন ডলার। চট্টগ্রামের মাফ লেদার নিজস্ব উদ্যোগে মানসম্মত কারখানা তৈরি করে আন্তর্জাতিক দামে চামড়া বিক্রি করছে।
মানে পথ আছে। সক্ষমতা আছে। দরকার শুধু সিদ্ধান্ত।
এখন বা কখনো নয়
২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা ২০২৯ পর্যন্ত থাকবে। এর পর যদি শোধনাগার মেরামত ও আপগ্রেড না করা হয়, তাহলে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। রপ্তানি আরও ৩০ শতাংশ কমার আশঙ্কা আছে।
সময় হাতে আছে তিন বছর।
গত তিন বছরে মাত্র দুটি নতুন সনদ পাওয়া গেছে। এই গতিতে ২০২৯ সালে পৌঁছানো অসম্ভব।
কিন্তু সমাধান কঠিন নয়।
এক. সাভারের বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর করতে হবে। হয় সরকারি অর্থায়নে সম্পূর্ণ করতে হবে, নয়তো দক্ষ বেসরকারি অপারেটরের হাতে দিতে হবে। এই একটি সমস্যা সমাধান হলে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক সনদ পেতে পারে।
দুই. কাঁচা চামড়া রপ্তানি স্থায়ীভাবে ও স্বচ্ছভাবে খুলে দিতে হবে। নির্ধারিত মান পূরণ করলে যে কেউ রপ্তানি করতে পারবে, এই নীতি চালু হলে দাম আপনা থেকেই বাড়বে।
তিন. জেলা পর্যায়ে তাৎক্ষণিক মূল্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে। আড়তদার সরকারি দামের নিচে চামড়া কিনলে জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
চার. একটি স্বায়ত্তশাসিত চামড়াশিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যারা এই খাতের সমন্বয়, নীতি বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করবে।
শেষ কথা
কোরবানির ঈদে লাখো পরিবার চামড়া সংগ্রহ করবে। মাদরাসার ছাত্ররা রাস্তায় নামবে। এতিমখানার কর্মীরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করবে।
তারা কি ন্যায্য দাম পাবে? নাকি আবারও হতাশ হবে?
সরকার ঘোষণা করেছে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু মাঠে কত দাম মিলবে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
চামড়ার দাম শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি একটি শিল্পের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। শত শত মাদরাসা-এতিমখানার টিকে থাকার প্রশ্ন।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি একটি দেশের সক্ষমতার প্রশ্ন। আমরা কি নিজের সম্পদকে মূল্য দিতে পারি? নাকি বছরের পর বছর একে পচতে দেখব?
উত্তর আমাদের হাতে। সময় এখনো আছে। তবে বেশি নয়।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
