মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল: ছাঁটাই আতঙ্কে খাইশি লিনজেরিতে শ্রমিক অসন্তোষ


চট্টগ্রামের মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বেপজা ইকোনোমিক জোনে অবস্থিত খাইশি লিনজেরি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডে এইচআর-অ্যাডমিন বিভাগের কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার মুক্তার পদত্যাগকে কেন্দ্র করে টানা দুই দিন শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।

শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কিছু কর্মকর্তার আচরণকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ও বেপজা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেছে।

জানা গেছে, চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান খাইশি লিনজেরি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের শুরুর দিকে শ্রমিক সংকট থাকলেও এইচআর-অ্যাডমিন কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার মুক্তার যোগদানের পর নিয়োগ কার্যক্রম জোরদার হয় এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে পরিচালিত হতে থাকে।

তবে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কর্মকর্তার মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিক্ষোভরত শ্রমিকদের অভিযোগ, কোম্পানির কমার্শিয়াল ম্যানেজার ও দোভাষী মোহাম্মদ জামান উল্ল্যা মালিকপক্ষকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন এবং স্থানীয় শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার চেষ্টা করছেন।

তাদের দাবি, মোহাম্মদ জামান উল্ল্যা অভিজ্ঞতার অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজের আত্মীয়স্বজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। পাশাপাশি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই স্থানীয় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, পূর্বে নারী শ্রমিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগে এক দোভাষীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এছাড়া কিছু কর্মকর্তা শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করেন এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিক রিফাতুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান বলেন, কিছু কর্মকর্তা প্রায়ই অতিরিক্ত ডিউটি করান এবং শ্রমিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। টিফিন ও খাবার সরবরাহ নিয়েও নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করা হয়। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় শ্রমিকদের ‘নাহিদা আক্তার মুক্তা ম্যাডামের লোক’ আখ্যা দিয়ে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান রিফাতুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান।

তবে শ্রমিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোম্পানির কমার্শিয়াল ম্যানেজার ও দোভাষী মোহাম্মদ জামান উল্ল্যা। তিনি জানান, এইচআর কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার মুক্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে কারণেই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। এখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপের কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলে জানান মোহাম্মদ জামান উল্ল্যা।

এ বিষয়ে বেপজা ইকোনোমিক জোনের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, খাইশি লিনজেরিতে স্থানীয় শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে—এমন কোনো তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদ এনামুল হক আরও জানান, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শ্রমিকের মধ্যে মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ১০০ শ্রমিক রয়েছেন। পদত্যাগকারী কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার মুক্তার বিরুদ্ধে কোম্পানির কাছে বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে এবং সেসব অভিযোগ পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন বলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ মোহাম্মদ এনামুল হককে জানিয়েছে।

অন্যদিকে নাহিদা আক্তার মুক্তা দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংকট দূর করতে ভূমিকা রেখেছেন। তার অভিযোগ, পরবর্তীতে কিছু কর্মকর্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শ্রমিকদের সঙ্গে অসদাচরণ শুরু করেন এবং একপর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ স্থানীয় শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার চাপ সৃষ্টি করেন।

নাহিদা আক্তার মুক্তা বলেন, তিনি বিষয়টি মেনে না নেওয়ায় দোভাষী মোহাম্মদ জামান উল্ল্যা তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা অভিযোগ তুলে মালিকপক্ষকে বিভ্রান্ত করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং এখনো স্থানীয় শ্রমিকদের হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান নাহিদা আক্তার মুক্তা।

এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বেপজা কর্তৃপক্ষ ও কোম্পানি ব্যবস্থাপনা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। শ্রমিকদের অভিযোগ ও কোম্পানির বক্তব্যের মধ্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি নিয়ে শ্রমিক মহলে নানা আলোচনা চলছে।

উল্লেখ্য, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের বেপজায় ২০২২ সালের নভেম্বরে চীনা মালিকানাধীন খাইশির প্রথম প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের জুন মাসে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।