পাঁচশো শিশুর নীরব অভিযোগ


একটি শিশু জ্বরে পুড়ছে। গায়ে র‍্যাশ। চোখ লাল। মা পাশে বসে আছেন, হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানেন না যে এই মুহূর্তে তাঁর সন্তানের শরীরে যে ভাইরাস ঢুকেছে, তা ঠেকানো যেত। মাত্র একটা টিকায়। সেই টিকা ছিল না। কারণ কোথাও কেউ সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এই একটা সত্য মাথায় রাখুন, বাকি সব সংখ্যা পড়ুন।

১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৬৩ হাজারের বেশি শিশু। মৃত্যু ৫২৮। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে বরিশাল—কোনো বিভাগ বাদ নেই। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এ রোগ পৌঁছে গেছে। শুধু এপ্রিলের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করেছিল। এরপর মাস যত গেছে, সংখ্যা কেবল বেড়েছে।

৫২৮ শুনলে মনে হয় একটা সংখ্যা। কিন্তু ভাবুন, এই ৫২৮টি পরিবারে এখন কেউ নেই যাকে আর ডাকা যাবে না। কেউ নেই যার জন্য ঈদের কাপড় কেনা হয়েছিল, যে হয়তো স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি মায়ের মুখ আছে, একটি বাবার নীরবতা আছে, একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প আছে। পরিসংখ্যান সেই গল্প বলে না।

হাম কোনো রহস্যময় রোগ নয়। এর কোনো নতুন চিকিৎসা লাগে না, কোনো দুর্লভ ওষুধ লাগে না। একটা টিকা—যা দশকের পর দশক ধরে আছে, যা বিশ্বের অনেক দেশে এই রোগকে প্রায় নির্মূল করে ফেলেছে। বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উদাহরণ ছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেই সাফল্যের গল্প বলা হতো গর্বের সঙ্গে। সেই দেশে কীভাবে এত শিশু এই রোগে মারা গেল?

উত্তর খুঁজতে গেলে কোনো একটি মুখের দিকে আঙুল তুললেই হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টিকার আওতা কমে গেছে, মজুত ফুরিয়েছে, আর ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী কোনো বাড়তি টিকাদান অভিযান হয়নি। এটি শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের গল্প নয়, আগের সরকারগুলোরও দায় আছে। দীর্ঘদিন ধরে বস্তি, দুর্গম এলাকা ও প্রান্তিক পরিবারের কাছে টিকা পৌঁছায়নি—এটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, কোনো একটি সরকারের একক দোষ নয়। জনস্বাস্থ্যের সাফল্য একদিনে তৈরি হয় না, ধ্বংসও হয় না—ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। সেই ক্ষয় বছরের পর বছর ধরে জমছিল।

কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক যে তথ্যটি সামনে আসছে তা হলো—বিপদের সংকেত আগেই ছিল।

ইউনিসেফ বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা সরকারকে বারবার সতর্ক করেছে—পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি, দশটির মতো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। সংস্থাটির প্রতিনিধি স্পষ্ট করে বলেছেন, ফেব্রুয়ারির চিঠি ছিল ধারাবাহিক সতর্কতার একটি অংশ, প্রথম সতর্কবার্তা নয়। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়নি, বিলম্ব হয়নি, ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহও বন্ধ করা হয়নি।

দুই পক্ষের বক্তব্যে মিল নেই। আর এই ফাঁকের মধ্যে মারা গেছে ৫২৮ শিশু।

এখানে প্রশ্ন রাজনীতির নয়, প্রশ্ন নথির। চিঠিগুলো কোথায়? কোন তারিখে পাঠানো হয়েছিল, কার দপ্তরে গিয়েছিল, কোনো লিখিত জবাব ছিল কি না? সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কোন বৈঠকে? টিকার মজুত কখন নিরাপদ মাত্রার নিচে নেমেছিল, কে তা জানত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে কাগজে, বক্তব্যে নয়। ইউনিসেফকেও একই জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতে হবে—তারা কতটা স্পষ্ট ভাষায়, কতটা জোরালোভাবে সতর্ক করেছিল, তা-ও জানতে হবে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার—সরকার হয়তো খরচ কমাতে চেয়েছিল, সেটা অসৎ উদ্দেশ্য নয়। জনগণের টাকার হিসাব রাখা সৎ দায়িত্ব। কিন্তু সেই হিসাব মেলাতে গিয়ে যদি কয়েক মাস সময় নষ্ট হয়, টিকা না আসে, আর শিশু মরে—তাহলে সাশ্রয়ের পুরো হিসাবটাই উল্টে যায়। কারণ সাশ্রয় হয় টাকার, মূল্য দেওয়া হয় জীবন দিয়ে। সেই বিনিময় কোনো অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে যুক্তিসঙ্গত নয়।

একটি চিঠি দেরিতে পড়া। একটি ফাইল দেরিতে সরানো। একটি ক্রয়াদেশ দেরিতে দেওয়া। প্রশাসনের খাতায় এগুলো ছোট ঘটনা, রুটিন কাজের ফাঁকে হারিয়ে যাওয়া তারিখ। কিন্তু জনস্বাস্থ্যে এই দেরির মূল্য দিতে হয় শিশুর জীবন দিয়ে। একটা টিকা কয়েক দিন দেরিতে আসা মানে একটা শিশু কয়েক দিন আগে আক্রান্ত হয়ে যাওয়া—আর সেই শিশুর শরীর যদি লড়াইটা হেরে যায়, তাহলে সেই দেরির দায় কার?

এখন ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান অভিযান চলছে, ১২ লাখের বেশি শিশুকে লক্ষ্য করে। দেরিতে হলেও শুরু হয়েছে, এটুকু স্বস্তির। কিন্তু যারা মারা গেছে, তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। কারণ স্মৃতি না থাকলে শিক্ষাও থাকে না, আর শিক্ষা না থাকলে পরের বার আবার একই ভুল হবে।

বাংলাদেশের এখন একটাই দরকার—সত্য। প্রতিশোধের জন্য নয়, ভবিষ্যতের শিশুদের বাঁচানোর জন্য। একটি স্বাধীন, নথিভিত্তিক তদন্ত হোক। আগের সরকারগুলো কেন টিকাদান কর্মসূচিতে ফাঁক তৈরি হতে দিল, সেই প্রশ্নের জবাব দিক। অন্তর্বর্তী সরকার কোন সিদ্ধান্তে কতটা সময় নষ্ট করল, সেই হিসাব দিক। আর ইউনিসেফ তাদের সতর্কবার্তার পুরো নথি প্রকাশ করুক—তারিখ, প্রাপক, ভাষা সমেত।

কে জানত, কখন জানত, কী করল বা করল না—সব প্রকাশ পাক। কারণ যে শিশুরা চলে গেছে, তারা কোনো বড় কিছু চায়নি। শুধু একটা টিকা চেয়েছিল। সময়মতো।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।