
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে গভীর রাতে র্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলায় অংশ নিয়েছেন দুইশ থেকে তিনশ সশস্ত্র ব্যক্তি। এ সময় এক্সকাভেটর বা খননযন্ত্র দিয়ে নির্মাণাধীন নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে রাস্তার কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়েছে।
র্যাব জানিয়েছে, এই হামলায় একে-৪৭-এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (২৪ মে) দিবাগত রাত এক থেকে দুইটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম ও র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চলছে। আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। যে ক্যাম্পটি সন্ত্রাসীরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, সেটি তারই উদ্বোধন করার কথা ছিল।
হামলায় অংশ নেয় ২০০-৩০০ সন্ত্রাসী
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, যাদের অভিযান চালিয়ে এখান থেকে তাড়ানো হয়েছিল, সেই সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিন গ্রুপের ২০০ থেকে ৩০০ জন লোক সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে-৪৭-এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান আরও জানান, হামলাকারীরা এক্সকাভেটর দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয়। ওই স্কুলের শেষ প্রান্তে যৌথ বাহিনীর নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি হচ্ছিল, যার ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। এক্সকাভেটর দিয়ে সেটি প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীরা গুলি করে যৌথ বাহিনীর লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। ক্যাম্পের পাশের পাহাড়ে থাকা নতুন কয়েকটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে তারা গুলি ছুড়েছে। র্যাবের লোকজন মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পাল্টা গুলি চালিয়েছে এবং এতে যৌথ বাহিনীর কেউ হতাহত হয়নি বলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান নিশ্চিত করেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যাতায়াতের রাস্তার বেশ কয়েকটি অংশ এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো যানবাহন ব্যবহার করতে না পারে এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে।
এসপি মাসুদ আলম আরও জানান, আলীনগর স্কুলে র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা অবস্থান করছিলেন এবং সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য ছিল ফোর্স যেন সেখান থেকে বের হতে না পারে। পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ১০৪টি গুলি ছোড়া হয়েছে উল্লেখ করে এসপি মাসুদ আলম জানান, যৌথ বাহিনীর শটগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাসগান ব্যবহারের মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধের কারণে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের ভেতর ঢুকতে পারেনি।
হামলার খবর পেয়ে রাতেই র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয়। কামাল হোসেন নামে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিজের ফেসবুক আইডিতে অভিযানের বেশ কয়েকটি ভিডিও আপলোড করেন। ভিডিওতে র্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেনকে বলতে শোনা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট এবং রাস্তা কেটে দিয়েছে। ওরা মনে করেছে যে ওদের কৌশলের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরাজিত হয়ে যাবে, কিন্তু বাহিনী যে ওদের চেয়ে আরও বেশি কৌশলী, সেটা ওরা বুঝতে পারেনি বলে কামাল হোসেন মন্তব্য করেন।
জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান পরিস্থিতি ও পটভূমি
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে পাহাড়ের ভেতরে একটি সড়ক ঢুকে গেছে এবং সে পথেই শুরু জঙ্গল সলিমপুর। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ছিন্নমূল ও আলীনগর নামের দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটিতে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।
গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথ অভিযানের মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেই অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন উদ্দিন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক এবং গোলাম গফুরসহ কয়েকজন এখনো পলাতক রয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, অভিযানের আগে ছিন্নমূল এলাকা রোকন উদ্দিনের দখলে আর আলীনগর এলাকা মো. ইয়াসিনের দখলে ছিল।
সোমবার (২৫ মে) সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে আলীনগর স্কুল এলাকায় অভিযানে গিয়ে সাংবাদিকদের এসপি মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যত ঝাঁকুনি দিক, তাদের পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। মো. ইয়াসিন, রোকন উদ্দিন বা যারাই জড়িত থাকুক, সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে এসপি মাসুদ আলম দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
