সাতকানিয়ায় সড়ক দখল করে পশুর হাট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট


স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞাকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়ায় মহাসড়কের ওপর বসানো হয়েছে কোরবানির পশুর হাট। আর এতে দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা পড়ে নাকাল হয়েছেন যাত্রী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দূরপাল্লার যানবাহনের যাত্রীরা।

সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে বাজালিয়া এলাকায় পশুর হাটে গরু কেনাবেচা শুরু হলেও দুপুরের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিকেলে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বুড়ির দোকান থেকে বাসস্টেশন সংলগ্ন শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কের বড় অংশজুড়ে গড়ে ওঠে অস্থায়ী পশুর হাট। এতে বান্দরবান-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী যানবাহনের চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই কায়দায় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে পশুর হাট বসলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না। বরং প্রশাসনের নীরব ভূমিকা ও তদারকির উপস্থিতি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— জনগণের ভোগান্তির দায় তাহলে কার? প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাজার এলাকায় উপজেলা ও থানা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। বাজালিয়া বাসস্টেশনে সড়কের দক্ষিণে জমজম হোটেলের সামনে প্যান্ডেল তৈরি করে বাজার তদারকিও করা হয়।

জানা গেছে, বিএনপি নেতা আনিস সিকদার একদিনের জন্য বাজারটির ইজারা নেন। যদিও ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য বাজারটি ‘হাসিলমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধার আড়ালে হাজারো মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ যেন কারও নজরেই পড়েনি।

বান্দরবানগামী বাসযাত্রী নজরুল ইসলাম টিটু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সড়কে পশুর হাট বসানোর কোনো অনুমতি থাকার কথা না। অথচ প্রশাসন জেনেশুনে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত সহজে যেতে পারছে না। এটা চরম দায়িত্বহীনতা বলে মন্তব্য করেন নজরুল ইসলাম টিটু।

সাঙ্গু ট্রাভেলসের যাত্রী মুহাম্মদ জহিরুল ইসলামও একই অভিযোগ তুলে বলেন, ঈদের আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ করে হাট বসানো সাধারণ মানুষের সঙ্গে নির্মম তামাশার শামিল। পশুর হাট বসানোর ফলে এই বাজারটি পার হতে এক ঘণ্টা সময় লাগছে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে বলে জানান মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।

মাইক্রোবাস চালক এনামুল হক বলেন, প্রতি বছর একই চিত্র দেখা যায়। সড়কের ওপর পশুর হাট মানেই যানজট, বিশৃঙ্খলা আর দুর্ঘটনার ঝুঁকি। প্রশাসন চাইলে এটি বন্ধ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না বলে উল্লেখ করেন এনামুল হক। বাসচালক আব্দুল কুদ্দুসও জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হচ্ছে এবং যাত্রীদের ক্ষোভ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত স্থানের বাইরে জনবহুল সড়কের ওপর পশুর হাট বসানো সম্পূর্ণ অনিয়ম ও জনস্বার্থবিরোধী। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থী ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল সড়ক দখল করে পশুর হাট বসানো যাবে না। কিন্তু সেই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কার্যকর করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। ফলে প্রতি বছরই জনদুর্ভোগ বাড়ছে।

তবে ইজারাদার আনিস সিকদার দাবি করেন, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের পক্ষে তার নামে বাজারটির ইজারা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত ভলান্টিয়ার রয়েছে এবং তারা আশা করছেন যানজট নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রতি বছরের মতো এবারও একই নিয়মে হাট বসেছে বলে জানান আনিস সিকদার।

অন্যদিকে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, সড়কের ওপর পশুর হাট বসানোর কোনো অনুমতি নেই। ইজারা দেওয়ার সময় তা স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। সড়ক দখল করে হাট বসানো হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।

তবে প্রশ্ন উঠেছে— বছরের পর বছর একই স্থানে সড়ক দখল করে পশুর হাট বসলেও প্রশাসনের ‘খতিয়ে দেখা’ কেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে? জনস্বার্থের চেয়ে কি প্রভাবশালীদের স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ? সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি— সড়ক দখলমুক্ত হোক, পশুর হাট হোক নির্ধারিত স্থানে।