সরকারের ১০০ দিন: ২৬ সাফল্যের দাবি, তবে অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ


ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে আজ বুধবার। বড়ো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হলো। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ১০০ দিনে তাদের অন্যতম সফলতা হচ্ছে, সব শিল্পকারখানায় ঈদের আগে বেতন, বোনাস ও সুবিধা পরিশোধ নিশ্চিত করা। ১০০ দিনের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিএনপি দাবি করেছে, ‘এখন ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না, বরং প্রধানমন্ত্রীই তাঁদের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন।’

আজ বুধবার দুপুরে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সরকারের ১০০ দিনের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে মোটাদাগে ২৬টি ‘সফলতার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের চোখে ১০০ দিনের উল্লেখযোগ্য সাফল্য

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের কর্মসূচি নিয়ে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তাঁর বক্তব্য ও বিএনপির প্রকাশ করা তথ্যানুযায়ী ১০০ দিনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হলো:

১. ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পেয়েছে ৫৩ হাজার ৯৬টি পরিবার এবং ‘কৃষক কার্ড’ পেয়েছে ২০ হাজার ৭৪৮টি পরিবার।

২. ১০০ দিনে শতভাগ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে এবং ৬৬৬টি খালে খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

৩. প্রায় ৬ হাজার ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রধানেরা মাসিক ভাতা পাচ্ছেন।

৪. ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

৫. পদ্মা ব্যারাজের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা থেকে সরাসরি উপকৃত হবে দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ।

৬. যুদ্ধাবস্থায় ভর্তুকির মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং ২০ মে পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

৭. মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছে।

৮. ২৪ মে পর্যন্ত ১০টি কেবিনেট সভায় ৬০টি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার ৩৭টি ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।

৯. ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ চলমান রয়েছে এবং ৫৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্লাবে ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

১০. ভূমিসেবা অটোমেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং ১৪টি বোয়িং যুক্ত করে বিমান বহর সম্প্রসারণের চুক্তি হয়েছে।

১১. ১৫২ জন জুলাই যোদ্ধাকে রাশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১২. ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে মাসিক ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে।

১৩. সব শিল্পকারখানায় ঈদের আগে বেতন, বোনাস ও সুবিধা পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়েছে।

১৪. ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

১৫. প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মেট্রোরেল ও ট্রেনে ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

১৬. প্রায় ৩৮ হাজার কসাইকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশুর চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

১৭. অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০’ রাডার দ্বারা আকাশসীমা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

১৮. বাংলাদেশের পাসপোর্টে আবারও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ যুক্ত করা হয়েছে।

১৯. দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

২০. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ১০টি দেশের মধ্যে ৩টির সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

অর্থনীতিতে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট

সরকারের প্রথম একশ দিনের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা ছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যাংক খাতের সংস্কার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা নিয়ে সরকার কাজ করছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আসন্ন বাজেটেই বোঝা যাবে যে সরকার আসলে অর্থনীতি নিয়ে কী ভাবছে। তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার ইতিবাচক বার্তা দিলেও বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এখনও অনেক কিছু করার বাকি। ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের পেশাদারিত্ব

রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলে আশা করা হলেও, পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ এ প্রসঙ্গে তাঁর মতামত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে নিরাপত্তা বাহিনী বা বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা এখনও ফেরেনি। রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, পুলিশ এখনও নিজেদের সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি এবং পেশাদারিত্বের জায়গায় আসতে পারেনি।

রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও হাম পরিস্থিতি

রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি সরকারকে নানামুখী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জাতীয় সংসদে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সামাল দেওয়া সরকারের জন্য একটি বড়ো পরীক্ষা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান মনে করেন, এখন পর্যন্ত সরকার বিরোধী দলগুলোর সাথে সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পরিবেশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার লক্ষণ। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সরকার যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারে, তবে শিগগিরই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা সরকারকে আরও চাপে ফেলবে। অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান আরও উল্লেখ করেন, সরকার ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ডের মতো পদক্ষেপগুলো আগে বাস্তবায়ন করে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের পাশাপাশি বিরোধীদেরকেও একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে, একশ দিনের এই সরকারকে হাম ইস্যু বেশ ভোগাচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে পাঁচশর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।