
ঈদুল আজহা এসেছে। আবার বছরের পরিক্রমায় ফিরে এসেছে সেই দিনটি, যখন পুরো বিশ্বের মুসলমান একই মুহূর্তে একই আবেগ নিয়ে দাঁড়ায়। হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর প্রিয়তম পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মহান আল্লাহর নির্দেশে নিবেদন করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, তখনই শুরু হয়েছিল ত্যাগের এই অমর ইতিহাস। আজ চৌদ্দ শত বছর পর, সেই ত্যাগের ধারায় নিজেদের ডুবিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।
কিন্তু এবারের ঈদ আর আগের মতো নয়। এবারের ঈদ এসেছে একটি দেশকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া মাপলের পটভূমিতে। এসেছে পাঁচশোর বেশি শিশুর মৃত্যুর শোকে। ঈদের মাঠে খেলবে আজ বেঁচে থাকা শিশুরা, আর হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের পাশে থাকবেন হতভম্ব অভিভাবকরা। ডাক্তার ও নার্সদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মহান এই পবিত্র উৎসবে দেশ তাই পরিপূর্ণতার বদলে পাচ্ছে পূর্ণতার আভাস।
ত্যাগের প্রকৃত অর্থ
কোরবানি কেবল পশু জবাই করা নয়। এটি মানুষের অন্তরের লোভ, হিংসা ও অহংকার পরিত্যাগের আহ্বান। যখন একজন মুসলমান তার সামর্থ্যবান অর্থ দিয়ে একটি পশু ক্রয় করে এবং সেটি কোরবানি করে, তখন সে বার্তা পাঠায় যে তার সম্পদেও অন্যের অধিকার রয়েছে। কোরবানির মাংস বিতরণ শুধুমাত্র দাতব্যতা নয়, এটি একটি সামাজিক দর্শনের প্রকাশ।
কিন্তু এই দর্শনই তো আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রয়োজন। যেখানে একদিকে মহামারী আক্রান্ত শিশুরা অক্সিজেনের অভাবে মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা বন্যায় তাদের ফসল হারাচ্ছে, সেখানে কোরবানির ত্যাগের শিক্ষা আমাদের ফিরিয়ে আনতে পারে মানবিকতার পথে।
সরকার যদি এই সময়ে বিপর্যস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ায়, যদি সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো হাম আক্রান্তদের জন্য এগিয়ে আসে, যদি স্বেচ্ছাসেবক দল বন্যা-বিপর্যস্ত কৃষকদের সেবা করে, তখনই কোরবানির প্রকৃত অর্থ উদ্ভাসিত হয়। উৎসবের আনন্দ তখনই সত্যিকারের হয়ে ওঠে, যখন সেই আনন্দ সবার মুখে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
পরিবেশ ও সভ্যতার পরীক্ষা
কোরবানির সাথে জড়িয়ে আছে পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। কোরবানির পশুর রক্ত, বর্জ্য, চামড়া—এর ব্যবস্থাপনা কেবল পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি আমাদের সভ্যতার প্রতিফলন। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে কোরবানি সম্পন্ন হয়, যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়।
আমাদের দেশেও ধীরে ধীরে এই সচেতনতা বাড়ছে, কিন্তু এখনো অনেক পথ বাকি। শহরের রাস্তায় রক্ত, নর্দমায় বর্জ্য, বাতাসে দুর্গন্ধ—এটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি কোরবানিদাতার দায়িত্ব যেমন নির্ধারিত স্থানে কোরবানি করা, তেমনি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব দ্রুত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। এই দুই পক্ষের সমন্বয়েই সম্ভব পরিবেশ-বান্ধব একটি ঈদ উদযাপন।
চামড়া বাজার: অসহায়দের অধিকার
কোরবানির চামড়া নিয়ে গত কয়েক বছর যে নৈরাজ্য দেখা গেছে, তা হতাশাজনক। চামড়া শুধু একটি পণ্য নয়, এটি অসহায় মানুষের জীবিকা। সারা বছর যে সংখ্যক পশু জবাই হয়, তার প্রায় অর্ধেক হয় কোরবানির ঈদে। এই বিশাল বাজারকে সিন্ডিকেট ব্যবসার হাত থেকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।
এছাড়া চামড়াশিল্প আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে আমাদের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সচেতন হতে হবে। চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ ও অসহায়দের অধিকার রক্ষা এই তিনটিই একসাথে চিন্তা করতে হবে।
নিরাপদ ঈদযাত্রা: সরকার ও নাগরিকের দায়িত্ব
প্রতি বছর ঈদের সময় গ্রামে ফেরার যাত্রা হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এবারও সোমবার টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুর দায় শুধু চালকের উপর নয়, দায় আছে পরিবহনকারী, যারা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়েছে। দায় আছে সরকারের, যারা নজরদারি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হলে তিনটি বিষয় সমন্বিত হতে হবে: প্রথমত, পরিবহন মালিকদের আইনি শৃঙ্খলা। দ্বিতীয়ত, যাত্রীদের সচেতনতা—অতিরিক্ত ভাড়ায় উঠবেন না, পূর্ণ আসন নিশ্চিত করবেন। তৃতীয়ত, সরকারের কঠোর নজরদারি ও শাস্তির নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশি হাজিদের জন্য শুভেচ্ছা
এ বছর প্রায় ৭৯ হাজার বাংলাদেশি হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছেন। তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য আমাদের প্রত্যাশা ও প্রার্থনা রয়েছে। তারা যেন বহনকারী পরিবহনে ফিরে আসেন না, যেন হাজ সম্পন্ন করে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
শেষ কথা
ঈদুল আজহা সুখের দিন, কিন্তু তা সবার জন্য সমান নয়। যারা আক্রান্ত শিশুর পাশে আছেন, তাদের জন্য এটি শোকের দিন। যারা ফসল হারিয়েছেন, তাদের জন্য এটি দুর্যোগের দিন। তাদের কথা মনে রেখে, ত্যাগের প্রকৃত অর্থ বুঝে উদযাপন করি এই পবিত্র উৎসব।
আমাদের সকল পাঠক, লেখক, গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক ঈদ মোবারক।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
