চামড়ার বাজারে সংকট: যেখানে প্রতিশ্রুতি আছে কিন্তু ক্রেতা নেই


চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো। কোরবানির ঈদের সময়ে এখানকার চামড়ার বাজার সাধারণত মুখর থাকে ব্যস্ততায়। ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান—সবকিছুতেই থাকে গরু ও ছাগলের চামড়ায় ভরা পণ্য। এবার ছবিটি একই, কিন্তু পটভূমি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার বাজারে আছে পণ্য, কিন্তু নেই ক্রেতা। আছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু নেই লাভজনকতা। আর সেই শূন্যতায় গভীর ক্ষতির ছাপ ফেলছে হাজার হাজার মানুষের জীবনে।

দাম যেখানে আশা রাখেনি

সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট আকারের গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। মাঝারি চামড়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। বড় চামড়া, সর্বোচ্চ ৪০০ টাকায়। এই দামগুলি শুনলে মনে হবে বাজারে সস্তার উৎসব। কিন্তু বাস্তব? সম্পূর্ণ ভিন্ন।

মো. আলম নামের একজন সিজনাল ব্যবসায়ী আতুরার ডিপোতে দাঁড়িয়ে আছেন চিন্তায় নিমজ্জিত। তিনি গ্রামের বাজার থেকে একটি বড় গরুর চামড়া কিনেছিলেন ৪০০ টাকার কাছাকাছি দামে। তার উপর আছে গাড়ি ভাড়া, শ্রমিক খরচ। এখানে এসে আড়তদাররা ২০০ টাকার বেশি দাম দিতে চাইছেন না। তার প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত: “তাহলে আমরা কীভাবে টিকব?”

বাঁশখালী থেকে আসা রুবেলের গল্প একই রকম হতাশায় ভরা। তিনি বলেন, “ঈদের সময় একটু লাভের আশায় চামড়ার ব্যবসায় নামি। কিন্তু প্রতিবছরই লোকসান গুনতে হয়। এবারও সেই অবস্থা।” আর এই অবস্থা কোনো নতুন নয়—এটি বছরের পর বছর চলে আসা একটি দুষ্ট চক্র।

শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে সংকট

আড়তদাররাও কম বেশি একই কথা বলছেন। কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন একটি চামড়া প্রক্রিয়াকরণের খরচের হিসাব দেন। সংগ্রহ, পরিষ্কার, লবণ দেওয়া, সংরক্ষণ—সবকিছু মিলিয়ে শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচই পড়ে প্রায় ৪৫০ টাকা। এর পর আসে ঝুঁকি, পরিবহন খরচ, সংরক্ষণ ঝামেলা।

আর তারপর? তারপর আসে ট্যানারি। যেখানে চাহিদা নেই, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম পড়ছে, যেখানে অর্থ প্রদান হচ্ছে দেরিতে।

মুসলিম উদ্দিন সরলভাবে বলে দেন, “ট্যানারিগুলো সময়মতো টাকা দেয় না। আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দর কমেছে। এর ফলে পুরো বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।”

আর সেই অস্থিরতার বিষফল ছড়িয়ে পড়ে শিল্পের প্রতিটি স্তরে।

মাদরাসার চামড়া, হারানো স্বপ্ন

হাটহাজারীর একটি মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মো. আলী এসেছেন সদিচ্ছা নিয়ে। এলাকার কোরবানিদাতারা তাদের সওয়াবের উদ্দেশ্যে দান করেছেন ২৯টি চামড়া। মাদরাসার এতিমখানা এবং মিসকিন ফান্ডের জন্য। পবিত্র উদ্দেশ্যে।

শুভাকাঙ্ক্ষী ও ছাত্ররা ভ্যানে করে চামড়াগুলো মাদরাসায় নিয়ে এসেছে। তারপর গাড়িতে করে আতুরার ডিপোতে। মাওলানা আলী গণনা করতে শুরু করেন খরচ।

গাড়ি ভাড়া: আড়াই হাজার টাকা।
বিক্রয়মূল্য: তিন হাজার টাকা।

পার্থক্য? মাত্র পাঁচশো টাকা। এবং সেই পাঁচশো টাকার মধ্যে আছে সারাদিনের শ্রম, সংরক্ষণের খরচ, লবণের খরচ।

তিনি বলেন, “আমরা যারা সারাদিন এসব চামড়া নিয়ে কাজ করেছি, সবই বৃথা।” আর বৃথা শুধু তাদের পরিশ্রমই নয়—বৃথা হয়েছে কোরবানিদাতাদের দাতব্যের আবেগও।

শ্রমিকদের খালি হাত

রাত পৌনে আটটা। আতুরার ডিপোর বাজারে এখনও হালকা আলো জ্বলছে। কক্সবাজারের পেকুয়া থেকে আসা পনেরোজন যুবক অপেক্ষা করছেন। তাদের একজন হুমায়ুন কবির। গত চার বছর ধরে তিনি আসেন ঈদের দিন চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ করতে। একদিন-রাত কাজ করলে সাধারণত পেতেন তিন থেকে চার হাজার টাকা।

এবার? “কেউ কাজে নিচ্ছে না,” তিনি জানান। “আগের বছরগুলোর চেয়ে চামড়া কম এসেছে। শ্রমিকের চাহিদা কম।”

আর তার সাথে আসার বিনিয়োগ? গাড়ির ভাড়া? সেগুলোও এখন লসের দিকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের যুবক মো. দিদারও একই অবস্থায় আছেন। প্রতিবছর তিনি ঈদে চামড়া সংরক্ষণের কাজ করেন। এবার বলেন, “কাজ একেবারে কম। তাই অপেক্ষা করছি।”

অপেক্ষা—এটিই হয়ে উঠেছে এই ঋতুতে প্রধান কর্মকাণ্ড। অপেক্ষা কাজের জন্য, অপেক্ষা ক্রেতার জন্য, অপেক্ষা ভাগ্যের জন্য।

গত বছরের ভূত

২০২৫ সালে যা ঘটেছিল তার প্রভাব আজও টলমল করছে বাজারকে। সেই বছর বহু চামড়া বিক্রি হয়নি। পরিবর্তে হাজারো হাজার চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়ার হতাশাজনক ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার ক্ষত এখনও সেরেনি।

এর ফলে এবার অনেক পুরাতন ব্যবসায়ী নিয়েই আসেনি চামড়া। যারা এনেছে, তারাও বাধ্য হয়েছে খুবই কম দামে বিক্রি করতে। ভয়ের ছায়া কাটিয়ে ওঠা মানুষ আবার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়।

উৎসবের রূপান্তর

এক সময় কোরবানির ঈদে চামড়া সংগ্রহ ছিল লাভজনক ব্যবসা। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আসতেন আশা নিয়ে, ফিরে যেতেন লাভ নিয়ে। সেই দিনগুলো এখন অতীত।

আজ চামড়া শিল্পের এই সংকট শুধু চামড়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি সমাজের একটি বিস্তৃত সমস্যার প্রতিফলন—দাম নিয়ন্ত্রণের অভাব, সিন্ডিকেটের খেলা, অরাজকতা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পরিকল্পনার অভাব।

পুরাতন চামড়া ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস সরলভাবেই বলেছেন, “চামড়া জাতীয় সম্পদ। কিন্তু এই খাতটা এখনো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়নি।”

নৈরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্য

বাজারে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। জুতো, ব্যাগ, ওয়ালেট—এসবের দাম আকাশছোঁয়া। কিন্তু কাঁচা চামড়ার দাম গড়িয়ে পড়ছে। মাওলানা আলাউদ্দিন, একটি মাদরাসার শিক্ষক, এই বিষয়ে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন:

“আগে চামড়ার দাম বেশি ছিল কিন্তু চামড়াজাত পণ্যের দাম কম ছিল। এখন সময়ের ব্যবধানে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কিন্তু কাঁচা চামড়ার কোনো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এবার চামড়ার দামও গত বছরের চেয়ে বাড়িয়েছে সরকার। কিন্তু আড়তগুলো আরও কম দামে চামড়া খরিদ করতে চাইছে।”

সিন্ডিকেটের কথা আসে। তবে সরকার বলে সিন্ডিকেট নেই।

খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে আসা একটি মাদরাসার ছয়শো চামড়া

খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে একটি মাদরাসা নিয়ে এসেছে প্রায় ছয়শো চামড়া। মো. করিম, যিনি এই চামড়াগুলোর দেখাশোনা করছেন, অবাক হয়ে বলেন, “এখানে ১০০ টাকার বেশি কেউ দাম দিতে চাইছে না।”

এই একটি বাক্যেই চামড়ার বাজারের সম্পূর্ণ বাস্তবতা ধরা পড়ে।

প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, হতাশাজনক নীরবতা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন যে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন:

প্রথমত, সরকারি নজরদারি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা যা বিদেশী মানদণ্ড অনুসরণ করে।

তৃতীয়ত, ট্যানারি মালিকদের সাথে সমন্বিত উদ্যোগ যাতে চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য রাখা যায়।

কিন্তু এসবের কোনোটি নজরে পড়ছে না। ফলে প্রতিবছর—এবার এবারও—লোকসানের বোঝা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন ছোট ব্যবসায়ীরা।

সমাপনী চিত্র

আতুরার ডিপোর রাত্রিকালীন বাজারে এখনও কাজ চলছে। শ্রমিকরা লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করছেন। ভ্যান ও পিকআপ আসছে চামড়া নিয়ে। কিন্তু রাস্তা যা অন্য বছর জমজমাট থাকে গাড়ির জ্যামে, এখন সেই রাস্তা নিস্তব্ধ।

চট্টগ্রামের বয়োজ্যৈষ্ঠ শফিকুর রহমান রাত আটটায় দাঁড়িয়ে বলেন, “অন্য বছরগুলোতে এখানে চামড়া নিয়ে আসার গাড়ির জ্যাম লেগে যেত। এবার রাস্তা একেবারে ফাঁকা।”

ফাঁকা রাস্তা, খালি হাত, কাটা স্বপ্ন—এই হয়ে উঠেছে এই ঋতুর নিদর্শন। চামড়ার বাজার এখন শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, এটি হয়ে উঠেছে হতাশার প্রতীক। যেখানে প্রতিবছর আসে লক্ষ লক্ষ মানুষ আশা নিয়ে, এবং ফিরে যায় হতাশা নিয়ে।