
শনিবার বিকেল। লোহাগাড়ার আমিরাবাদ সুফিয়া মাদরাসার মাঠে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে শত শত কাঁচা চামড়া। রোদের তাপে গন্ধ বাড়ছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফেরদৌস। মুখে উদ্বেগ, চোখে হতাশা। তিনি জানেন, লবণ না দিলে এই চামড়াগুলো আর বিক্রির যোগ্য থাকবে না।
ঈদের দিন এবং পরদিন লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে হাজার হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছেন ফেরদৌস। প্রতিটি চামড়া কিনেছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বিভিন্ন মাদরাসা থেকে কেনা এই চামড়াগুলো সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত লবণ। কিন্তু লবণ নেই।
কোথাও লবণ নেই
ফেরদৌসের ভাষ্য শুনলে বোঝা যায়, কতটা অসহায় অবস্থায় পড়েছেন তিনি। “লোহাগাড়ায় কোনো লবণ ব্যবসায়ী নেই। আধুনগর পাঠিয়েছি, পদুয়া পাঠিয়েছি লবণ কিনতে। কিন্তু কোথাও লবণ পাচ্ছি না।”
শেষ পর্যন্ত বাজার থেকে প্যাকেটজাত লবণ কিনে চামড়ায় দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু এটি কোনো সমাধান নয়। শিল্প মানের লবণ ছাড়া চামড়া দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। আর বাজারের প্যাকেটজাত লবণের খরচ যোগ হলে প্রতিটি চামড়ায় লোকসান আরও বাড়বে।
ইউএনও অফিসের সেই নম্বর
কোরবানির একদিন আগেই ফেরদৌস গিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে। সেখানে একজন কর্মকর্তা তার নম্বর নথিভুক্ত করেছেন লবণ বরাদ্দের তালিকায়। পাশাপাশি একটি যোগাযোগের নম্বরও দিয়েছেন।
ফেরদৌস সেই নম্বরে বারবার ফোন করেছেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি।
তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, “আমি চামড়া ব্যবসায়ী হওয়ার পরও যদি আমাদের লবণ না দেওয়া হয়, তাহলে ওই লবণগুলো কাদের কাছে গেল?”
প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তর অস্বস্তিকর।
প্রশাসনের জবাব
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, “সরকার থেকে যতটুকু লবণ বরাদ্দ ছিল, সব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। আমি অফিসে যোগদান করার আগেই তালিকা করা হয়েছিল। তালিকা অনুযায়ী বণ্টন করা হয়েছে।”
অর্থাৎ তালিকা আগের, বণ্টন আগের। কিন্তু ফেরদৌস যখন ঈদের আগে অফিসে নাম নথিভুক্ত করলেন, তখন কি কর্মকর্তারা জানতেন না যে লবণ শেষ? নাকি জেনেও একটি অর্থহীন নম্বর দেওয়া হয়েছিল তাকে?
এই প্রশ্নের জবাব অস্পষ্টই থেকে গেছে।
যে ক্ষতি সামনে আসছে
ফেরদৌসের বিপদ এখন দুইদিক থেকে। একদিকে সংগ্রহ করা চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। অন্যদিকে চামড়াপ্রতি যে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, তার বিপরীতে বাজারে যথাযথ মূল্য পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তিনি সামনের দিকে তাকিয়ে সতর্ক করে দেন, “এ বছর যারা চামড়া কিনেছে, তারা আর আগামী বছর এই মৌসুমি ব্যবসায় আসবে না।”
পুরো উপজেলায় মাত্র তিন-চারজন চামড়া ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে যদি ফেরদৌসের মতো একজনও ভবিষ্যতে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে এলাকার কোরবানির চামড়া কে সংগ্রহ করবে? মাদরাসাগুলো তাদের এতিমখানার ফান্ডের জন্য চামড়া বিক্রি করতে পারবে কার কাছে?
একটি ছোট্ট সংকটের বড় ছবি
লোহাগাড়ার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি সারাদেশের চামড়া খাতের সংকটের একটি স্থানীয় প্রতিফলন। সরকারিভাবে লবণ বরাদ্দ হয়, কিন্তু সেই লবণ ঠিকঠাক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নাম নথিভুক্ত হয়, কিন্তু ফোনে সাড়া মেলে না।
চামড়া জাতীয় সম্পদ। কোরবানির ঈদে এই সম্পদের বিশাল অংশ নষ্ট হয়, অযত্নে পচে, কিংবা অবমূল্যায়িত হয়। আর সেই ক্ষতির বোঝা বহন করেন ফেরদৌসের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা।
মাদরাসার মাঠে স্তূপ হয়ে পড়া চামড়াগুলো এখনও অপেক্ষা করছে। লবণের জন্য, ক্রেতার জন্য, একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ কোথায়, তা জানে না কেউ।
