
সত্যি সত্যিই আমাদের সবার প্রিয় যে গ্রহটিতে আমরা বসবাস করি, সেই পৃথিবী নামক গ্রহটি আজ বড় অশান্ত। বন-জঙ্গল, মাটি, পাহাড়, গাছপালা, সাগর-মহাসাগর ছেড়ে যখন আমরা ঊর্ধ্বাকাশের দিকে তাকাই, মহাকাশ স্টেশনে ঘুরে বেড়াই বা বিমানে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করি, তখন সেই ঊর্ধ্বাকাশ থেকে পৃথিবীকে এক অপরূপ নীল গোলকের মতো দেখায়। সমুদ্রের বিশাল জলরাশির ওপর যখন বিস্তৃত আকাশের ছায়া পড়ে, তখন পুরো পৃথিবীটাই যেন এক মায়াবী নীল রঙ ধারণ করে। এই কারণেই পৃথিবীকে বলা হয় ‘নীল গ্রহ’। স্রষ্টার এই বিশাল সৃষ্টিতে পৃথিবীর বাইরেও কত গ্রহ-নক্ষত্র ও ছায়াপথ রয়েছে, তা আমাদের কল্পনারও অতীত। কিন্তু এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে মহান সৃষ্টিকর্তা তার নিজের মতো করে নিপুণ হাতে সাজিয়েছেন তার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ এবং অন্যান্য সকল প্রাণীর জন্য।
শুধু মানুষের কথা বললে ভুল হবে; কারণ এই গ্রহে কত বিচিত্র ধরনের প্রাণী, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ এবং গাছপালা রয়েছে, তার সঠিক হিসাব আমাদের ধারণার বাইরে। সৃষ্টিকর্তার কী নিখুঁত পরিকল্পনা! একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় প্রতি মিনিট অক্সিজেনের জন্য তাকে কত টাকা গুনতে হয়! অথচ আমরা যারা সুস্থ আছি, আমাদের এই অমূল্য অক্সিজেনের জন্য একটি পয়সাও খরচ করতে হয় না। পৃথিবীতে যত মানুষ, প্রাণী বা কীটপতঙ্গ আছে, সবার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, অক্সিজেন ও বসবাসের স্থান সৃষ্টিকর্তা আগে থেকেই পরম যত্নে নির্ধারণ করে রেখেছেন।
অথচ এত প্রাচুর্যের মাঝেও মানুষ আজ যেন তার মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পড়া একটি কথা প্রায়ই মনে পড়ে—দুজন মানুষকে কখনো ক্ষমা করতে নেই: এক, যে আপনার রিজিকের ওপর আঘাত করে; এবং দুই, যে আপনাকে অহেতুক ছোট করে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষের মাঝে আর সেই মানবিকতা অবশিষ্ট নেই; মানুষ আজ যেন দানবে রূপান্তরিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বীভৎস ঘটনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র এবং মানবপাচার বা শোষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধগুলোর বিবরণ শুনলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে।
মহান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সব জায়গায় একই রকম সম্পদ দেননি। কোথাও তিনি দিয়েছেন উর্বর পলিমাটি, যেখানে সোনা ফলে; কোথাও দিয়েছেন তরল সোনা খ্যাত তেলের খনি; কোথাও ইউরেনিয়াম বা কয়লার বিশাল মজুত; আবার কোথাও দিয়েছেন অফুরন্ত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সামুদ্রিক সম্পদের ভাণ্ডার। এই ভিন্নতার মূল উদ্দেশ্য ছিল—পৃথিবীর সব মানুষ একে অপরের পরিপূরক হবে, এক বিশাল পরিবারের মতো মিলেমিশে থাকবে। কেউ স্বর্ণের বিনিময়ে তেল, কেউ তেলের বিনিময়ে চাল, আবার কেউ চালের বিনিময়ে প্রযুক্তি বা অন্য কোনো খনিজ সম্পদ আদান-প্রদান করবে। এই পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমেই সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে গড়ে উঠবে এক নিবিড় ভ্রাতৃত্ববোধ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, মানুষ আজ সেই সম্প্রীতির পথ থেকে বহুদূরে সরে গেছে।
প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকা গেয়েছিলেন, “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?” গানের কথায় তিনি আক্ষেপ করে এ-ও বলেছিলেন যে, মানুষ কখনো কখনো দানব হয়ে যায়। আজ আমরা সত্যিই সেই দানবে পরিণত হয়েছি। কেউ কাউকে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই। এই বিশ্বায়নের যুগে গরিব দেশগুলো যেন ধনী ও পরাশক্তিগুলোর হাতের খেলনা আর তাসের ঘরে পরিণত হয়েছে। “যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কী দোষ”—এই প্রবাদের মতোই পরাশক্তিগুলো যেভাবে নির্দেশ দেয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সেভাবেই চলতে হয়, অন্যথায় নেমে আসে মহাবিপদ।
বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলো আজ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। কে কাকে দাবিয়ে রাখবে, কে কার সম্পদ লুণ্ঠন করবে—এই অশুভ খেলায় মেতে তারা নীল গ্রহটিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। অথচ এই গ্রহে শুধু তারাই নয়, কোটি কোটি অবলা জীবজন্তু এবং নিরীহ মানুষেরও বসবাস। আজ চারদিকে শুধু বারুদের গন্ধ, বাতাসে কান্নার রোল। অবুঝ শিশু আর অসহায় নারীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস। কোথাও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, কোথাও জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে চরম ধ্বংসযজ্ঞ। এই অশুভ দ্বন্দ্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য অসহায় মানুষ আর ছোট ছোট শিশু।
এই অবুঝ শিশুরা তো যুদ্ধ কী তা জানে না। তারা জানে রাতের আকাশের ঝিকমিক করা তারার সৌন্দর্য, নরম ঘাসের ওপর জোনাকির আলো, আর সকাল-সন্ধ্যায় পাখির কলকাকলি। আপন মনে খেলাধুলা করা ছাড়া তারা আর কিছুই বোঝে না, বুঝতে চায়ও না। কিন্তু পরাশক্তিগুলো ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র, কামিকাজে ড্রোন, হোয়াইট ফসফরাস বোমা এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। পারমাণবিক বোমার ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা জাপান আজও ভুলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত বোমায় যে সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছিল, তার চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী বোমা আজ প্রস্তুত হয়ে আছে। এখনকার পারমাণবিক বোমাগুলো দিয়ে পৃথিবীকে কয়েকশ বার ধ্বংস করে দেওয়া কোনো ব্যাপারই নয়।
আজ পৃথিবীর কোথাও আর নিরাপদ আশ্রয় নেই। পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি, মেরু অঞ্চল বা সাগর—সবখানেই ওঁত পেতে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মারণাস্ত্র, সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে আছে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন, আর আকাশে উড়ছে বি-২ স্পিরিট-এর মতো বিধ্বংসী যুদ্ধবিমান। সৃষ্টিকর্তা না করুন, যদি কখনো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেই যায়, তবে এই নীল গ্রহের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না; এটি পরিণত হবে এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে। মানুষের হয়তো দোষ বা লোভ থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য, অবলা জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ আর গাছপালার তো কোনো দোষ নেই! তারা যখন সৃষ্টিকর্তার কাছে এই ধ্বংসের অভিযোগ জানাবে, তখন এই শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে আমরা কী উত্তর দেব?
তাই আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। এক দেশ আরেক দেশকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে পৃথিবী নামক এই নীল গ্রহটাকে রক্ষা করার ব্রত গ্রহণ করি। এটি আমাদের সবার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। বর্তমানে চারদিকের যে ভয়াবহ অবস্থা, তাতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের এই নীল গ্রহটি আজ বড়ই অশান্ত। পরিশেষে, এই নীল গ্রহটিকে রক্ষার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে বিনীত প্রার্থনা—যারা পৃথিবীকে অশান্ত করতে চাইছে, তিনি যেন তাদের অন্তরকে নরম করে দেন এবং তাদের মনে ভালোবাসার জন্ম দেন। পৃথিবী নামক এই নীল গ্রহটি সুস্থ ও শান্তিময় থাকুক, এটাই আজ আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
> উৎসর্গ: বিভিন্ন যুদ্ধে যে অগণিত অবুঝ শিশু নির্মমভাবে নিহত হয়েছে, আজকের এই কলামটি তাদের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম।
লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।
