
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন। রোগীর হাতে পুরনো ফাইল, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, অর্ধেক মুছে যাওয়া প্রেসক্রিপশন। ডাক্তার জিজ্ঞেস করছেন, আগে কী ওষুধ খেয়েছিলেন? রোগী মনে করতে পারছেন না।
এই দৃশ্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি চিরচেনা সমস্যার প্রতীক। কিন্তু এই চিত্র বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা এখন সরকারের টেবিলে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পুরো স্বাস্থ্যখাতকে আনা হবে ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায়। আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন, কেন্দ্রীয় রোগী ডাটাবেইস, ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম এবং প্রেসক্রিপশন অডিট। সাথে আসছে চিকিৎসকদের ফি ডিজিটাল মাধ্যমে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
সমস্যা যেখানে শিকড়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের তিনটি পুরাতন ক্ষত রয়েছে।
প্রথমত, রোগীর তথ্য সংরক্ষণের অভাব। একজন রোগী উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে সেই তথ্য পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় কাগজে। অনেক সময় সেই কাগজ হারিয়ে যায়, নষ্ট হয়, ভুল হয়। ফলে একই রোগীর একই পরীক্ষা বারবার করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, নগদ লেনদেনের অস্বচ্ছতা। অধিকাংশ বেসরকারি চেম্বারে ক্যাশে ফি নেওয়া হয়। রোগীকে দেওয়া হয় না কোনো রশিদ। ফলে চিকিৎসকদের প্রকৃত আয় থাকে আড়ালে।
তৃতীয়ত, অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। ভাইরাল জ্বর বা সাধারণ সংক্রমণেও লেখা হচ্ছে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক। ফলে বাড়ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই তিনটি সমস্যার সমাধান একসাথে খুঁজছে সরকার।
ই-প্রেসক্রিপশন: কী বদলাবে?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলম বলেন, “ই-প্রেসক্রিপশন, রেফারেল সিস্টেম ও অটোমেশন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হবে। ভবিষ্যতে প্রত্যেক রোগীর একটি ইউনিক স্বাস্থ্য পরিচিতি নম্বর থাকবে।”
এটি কেমন হবে? জাতীয় পরিচয়পত্রের মতোই একটি নম্বর, যা ব্যবহার করে দেশের যেকোনো হাসপাতাল থেকে রোগীর আগের সমস্ত চিকিৎসার ইতিহাস দেখা যাবে।
এই একটি পরিবর্তনেই কমবে অনেক সমস্যা। একই পরীক্ষা বারবার করার দরকার নেই। প্রেসক্রিপশন হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। ভুল তথ্যের কারণে চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি কমবে।
তিনি আরও বলেন, “উপজেলা হাসপাতাল থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত একটি ডিজিটাল রেফারেল চেইন তৈরি হবে। কোন রোগী কোথায় থেকে কোথায় গেলেন, কোন চিকিৎসক কী চিকিৎসা দিলেন, কোন পরীক্ষা করানো হলো—সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।”
প্রেসক্রিপশন অডিট: চিকিৎসকদের হস্তক্ষেপ নাকি জবাবদিহি?
পরিকল্পনার সবচেয়ে আলোচিত অংশ প্রেসক্রিপশন অডিট। এই ব্যবস্থায় চিকিৎসকদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করা হবে।
কোন চিকিৎসক অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক লিখছেন? কোন চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিচ্ছেন? কোন চিকিৎসক আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মানছেন না? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ডেটায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রেসক্রিপশন অডিট মানে চিকিৎসকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী চিকিৎসা হচ্ছে কি না, সেটা পর্যবেক্ষণ করা।”
তবে বিএমএর একজন নেতা সতর্ক করেন, “ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো উদ্যোগ। তবে এটি যেন চিকিৎসকদের হয়রানির হাতিয়ার না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
দুটো দৃষ্টিভঙ্গিই যুক্তিসঙ্গত। সমন্বয় করাই হবে সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ।
করের আওতায় আসছেন চিকিৎসকরা
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—চিকিৎসকদের ফি ডিজিটাল মাধ্যমে নেওয়া এবং সেই লেনদেনের রেকর্ড সংরক্ষণ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, “স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল লেনদেন চালু হলে কর ফাঁকি কমানো সহজ হবে। একজন চিকিৎসক দিনে কতজন রোগী দেখছেন, কত ফি নিচ্ছেন—সেসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে।”
তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গত বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি সরাসরি তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “চিকিৎসকরা যে ফি নেন তার রিসিট তো কোনো মানুষ নেয় না। এই ফি যদি ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে তার একটি রেকর্ড থাকবে।”
বিদেশে এই ব্যবস্থা স্বাভাবিক। বাংলাদেশেও যে এটি আসছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
একটি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মস্তিষ্ক
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিয়েল টাইমে জানতে পারবে:
কোন হাসপাতালে কত রোগী ভর্তি। কোথায় আইসিইউ খালি আছে। কোন ওষুধের ঘাটতি কোথায়। কোন এলাকায় কী ধরনের রোগ ছড়াচ্ছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। মহামারি প্রতিরোধে কাজে আসবে, দুর্যোগকালীন স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বয় সহজ হবে।
চ্যালেঞ্জ যেখানে অপেক্ষায়
পরিকল্পনাটি উচ্চাভিলাষী। কিন্তু বাস্তবায়নের পথে রয়েছে কয়েকটি বড় বাধা।
প্রথমত, অবকাঠামো সংকট। দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে এখনো কম্পিউটার অপারেটর পর্যন্ত নেই। দ্রুতগতির ইন্টারনেট নেই। প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ নেই। এই ভিত না তৈরি করে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলে কাজ হবে না।
দ্বিতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা। স্বাস্থ্য তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসে লক্ষ লক্ষ রোগীর তথ্য থাকলে সেটি হ্যাকারদের বড় লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই উদ্যোগ বিপজ্জনক হতে পারে।
তৃতীয়ত, চিকিৎসকদের মানসিকতা পরিবর্তন। যারা বছরের পর বছর ধরে কাগজে প্রেসক্রিপশন লিখে অভ্যস্ত, তাদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনতে প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ এবং আস্থা তৈরি।
স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝে
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত বহু দশক ধরে একই সমস্যার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কাগজের ফাইল, নগদ টাকা, অস্বচ্ছ লেনদেন, হারিয়ে যাওয়া তথ্য—এই সংস্কৃতি রাতারাতি পাল্টাবে না।
কিন্তু পরিবর্তনের শুরু হতে হবে কোথাও থেকে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। রোগী থেকে চিকিৎসক, হাসপাতাল থেকে মন্ত্রণালয়—সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।
সরকারের এই পরিকল্পনা যদি সত্যিকারের বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বদলে যাবে সেই চিরচেনা ছবি—দীর্ঘ লাইন, হলুদ ফাইল, মুছে যাওয়া প্রেসক্রিপশন।
প্রশ্ন একটাই: পরিকল্পনা থেকে বাস্তবে আসতে কতটা সময় লাগবে?
