সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে মৃত্যু: হত্যা মামলায় প্রবাসী ও নিরীহদের আসামি করার অভিযোগ


চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নের দূরদূরী এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত সেলিম উদ্দিনকে ঘিরে এলাকায় নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আসামি করায় এলাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের দাবি, নিহত সেলিম দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চরতী ইউনিয়নের পদ্মা পুকুরপাড় সংলগ্ন কবরস্থান এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন ও বেচাকেনার একটি চক্র সক্রিয় ছিল, যার অন্যতম সদস্য ছিলেন সেলিম উদ্দিন। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৮ নভেম্বর দক্ষিণ চরতীর খাটাখালী ব্রিজ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

ওই ঘটনায় আলমগীর হোসেনের স্ত্রী মর্তুজা বেগম বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে সেলিম উদ্দিনকে এক নম্বর আসামি করা হয়। পরে তিনি বিদেশে চলে যান এবং আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। সম্প্রতি দেশে ফেরার পরও তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করতেন এবং নিজ বাড়ি দক্ষিণ চরতীতে হলেও খতিরহাট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।

গত ২৮ মে বিকেলে দূরদূরী বোর্ড অফিস এলাকায় সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে স্থানীয়দের ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া করেন। কয়েকজন পালিয়ে গেলেও সেলিম উদ্দিনসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ আহত অবস্থায় তিনজনকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সেলিম উদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার পর নিহত সেলিম উদ্দিনের বাবা আবুল খায়ের বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বিএনপির কর্মী, ১৪ জন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং তিনজন জামায়াতের কর্মী রয়েছেন। মামলার এক ও দুই নম্বর আসামি দুই সহোদর ভাই, যারা দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর বর্তমানে এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

এছাড়া ১২ নম্বর আসামি মাইনুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং ৩০ নম্বর আসামি সুমনও বিদেশে রয়েছেন বলে স্বজনদের দাবি।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম জানান, মামলার কোনো আসামি কোন দলের রাজনীতি করেন বা কে দেশে আছেন, কে বিদেশে আছেন, সে বিষয়ে তার জানা নেই। বাদী আবুল খায়ের যে এজাহার দিয়েছেন, সেটিই মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সেলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে আগে কতগুলো মামলা ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানান, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আসামি গ্রেপ্তারের কাজে ব্যস্ত থাকায় এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে মামলার ভয়ে অনেক পরিবার ঘরছাড়া। প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সেই দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।