- আটক জানে আলম
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের মধ্যম গুয়াপঞ্চকের একটি জঙ্গল। সোমবার দুপুরে সেই জঙ্গলের ভেতরে আটকে আছেন এক যুবক। চারপাশে পাহারা দিচ্ছে একটি দল। মোবাইলে কথা বলছে তারা। দাবি একটাই—এক লাখ টাকা। নইলে পুলিশে দেওয়া হবে।
এটি কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্য নয়। এটি বাস্তব। এবং এই বাস্তবতাই বলে দেয়, আনোয়ারার মাদক চক্র কতটা সাহসী হয়ে উঠেছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল
জানে আলম প্রকাশ জনি। বাবা অটোরিকশা চালক। মূল বাড়ি শোলকাটা এলাকায়। তবে সেই এলাকায় আর থাকার সুযোগ নেই তার। মাদক, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিতে অতিষ্ঠ হয়ে শোলকাটাবাসী তাকে এলাকা থেকে বের করে দিয়েছিল আগেই।
এরপর থেকে জনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একাধিক মামলায় জেলে গেছেন, জামিনে বেরিয়ে আবারও ফিরেছেন একই পথে।
সোমবার ছিল তাঁর আবারও ধরা পড়ার দিন। বৈরাগ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ইয়াবা সেবনের সময় হাতেনাতে ধরে ফেলে কয়েকজন।
৫ পিস ইয়াবা, তারপর এক লাখ টাকার দাবি
ইউপি সদস্যের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জনি জানান, সেবনের জন্য তিনি গ্যারেজ মিস্ত্রি আসাদের কাছ থেকে ৫ পিস ইয়াবা কিনেছিলেন।
এই পর্যন্ত ঘটনা স্বাভাবিক। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা স্বাভাবিক নয়।
জনিকে ধরেছিলেন যারা, তারা পরিচয় দিলেন বিএনপির শ্রমিকদলের কর্মী হিসেবে। নাম বদি আলম, সিরাজ, হাকিম মিয়া। বদি আলম ঘটনার ভিডিও ধারণ করে পাঠালেন শ্রমিক দলের নেতা জামালকে।
তারপর জনিকে নিয়ে যাওয়া হলো মোহাম্মদ উল্লাহ পাড়ার পশ্চিমের এক জঙ্গলে। শুরু হলো দরকষাকষি। দাবি এক লাখ টাকা।
চাপ বাড়াতে ফোন করা হলো জনির স্ত্রীকে। নির্দেশ দেওয়া হলো, স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে দ্রুত টাকা নিয়ে আসতে হবে। নইলে চোর সাজিয়ে পুলিশে দেওয়া হবে।
মায়ের স্বর্ণ গেল, ছেলে গেল না
জনির মা পাখি আক্তার ছেলেকে বাঁচাতে যা করার তা-ই করলেন। স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রাখলেন। বদি আলমের হাতে তুলে দিলেন নগদ ৫০ হাজার টাকা।
কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও চক্রটি ছেলেকে ছাড়ল না। উলটো পুলিশে দিয়ে দিল।
মা আক্ষেপ করে বলেন, “টাকা নিল, তারপরও ছাড়ল না।” এই একটি বাক্যেই বোঝা যায়, এই চক্র কতটা নির্লজ্জ।
পাখি আক্তারের দাবি একটাই—চাঁদাবাজির বিচার চাই।
ইউপি সদস্যের উদ্যোগে উদ্ধার
এদিকে খবর পেয়ে ইউপি সদস্য ইলিয়াছ কাঞ্চন রুবেল চক্রের একজনকে ফোন করলেন। তারা ফোন রিসিভ করল না, বন্ধ করে দিল।
তখন রুবেল নিজেই উদ্যোগ নিলেন। স্থানীয় লোকজন নিয়ে চারদিক থেকে জঙ্গল ঘেরাও করে উদ্ধার করলেন জনিকে।
পুলিশের অনীহা ও ওসির হস্তক্ষেপ
উদ্ধারের পর ডাকা হলো পুলিশ। সিইউএফএল ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আমির ঘটনাস্থলে এলেন। কিন্তু অভিযুক্তকে হেফাজতে নিতে দেখালেন চরম অনীহা।
এলাকাবাসী তখন সরাসরি আনোয়ারা থানার ওসি জুনায়েদ চৌধুরীকে ফোন করলেন। ওসির নির্দেশেই কেবল এসআই আমির জনিকে থানায় নিয়ে যেতে বাধ্য হলেন।
প্রশ্ন থেকে যায়: ওসির ফোন না পেলে কি এসআই আমির আদৌ কিছু করতেন?
মাদক সরবরাহের চেইন
জিজ্ঞাসাবাদে জনি যে তথ্য দিয়েছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, কালাবিবির দিঘীর গ্যারেজ মিস্ত্রি আসাদের কাছ থেকেই তিনি মূলত ইয়াবা সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি গুয়াপঞ্চক এলাকায় হাকিম নামের আরেক কারবারিও ইয়াবা সরবরাহ করেন।
অভিযুক্ত গ্যারেজ মিস্ত্রি আসাদ অবশ্য সব অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, জনিকে চেনেনই না।
ওসি জুনায়েদ চৌধুরী জানিয়েছেন, উদ্ধারের সময় স্থানীয়রা কোনো ইয়াবা দিতে পারেনি। তবে জিজ্ঞাসাবাদের পর জনিকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যে প্রশ্নগুলো থাকছে
এই ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে।
প্রথমত, বিএনপির শ্রমিক নেতা পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ স্পষ্ট। কিন্তু তারা কি আইনের আওতায় আসবেন?
দ্বিতীয়ত, পাখি আক্তার যে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন, তা কি ফেরত পাবেন? তার স্বর্ণালঙ্কার কি ছাড়া পাবে?
তৃতীয়ত, এসআই আমিরের অনীহার বিষয়টি কি তদন্ত হবে?
চতুর্থত, গ্যারেজ মিস্ত্রি আসাদ এবং হাকিমের বিরুদ্ধে অভিযান কবে?
আনোয়ারার এই ঘটনা দেশের মাদক সমস্যার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র। মাদক সেবনকারী ধরা পড়ে। কিন্তু সরবরাহকারী থাকে আড়ালে। যারা ধরে তারা চাঁদা নেয়। পুলিশ থাকে অনিচ্ছুক।
এই চক্র ভাঙতে না পারলে রামিসার মতো আরও অনেকে হারিয়ে যাবে। আর পাখি আক্তারের মতো আরও অনেক মা কাঁদবেন অন্ধকারে।

