পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর পদত্যাগের নেপথ্যে কী?


সরকার গঠনের মাত্র ১০২ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।

ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবস সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।

শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে তিনি পদত্যাগ করলেও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কোন্দলকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অসুস্থতা নাকি বাধ্যবাধকতা?

পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান উল্লেখ করেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন এবং এই অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজে সমস্যা হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে অব্যাহতি নেওয়া আবশ্যক বলে তিনি মনে করেন।

তবে এই পদত্যাগকে স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাধ্যতামূলক বলে মনে করছে তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র।

গত এক মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছিল।

তিনি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তগুলো এককভাবে নিচ্ছিলেন এবং দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সমন্বয় করছিলেন না।

এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাঁর নির্দেশেই দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও জেলা পরিষদ গঠন

পদত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বিশেষ করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে দুজনের মধ্যে মতভিন্নতা ছিল।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন।

অন্যদিকে, দীপেন দেওয়ান তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে এই পদে বসাতে চেয়েছিলেন।

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কৃষিবদ কাজী তালুকদার।

তবে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দ্বন্দ্বের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, দীপেন চাচার সঙ্গে তাঁর কোনো দূরত্ব নেই এবং তাঁর বাবা সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন জুডিশিয়ারিতে থাকার সময় তাঁরা সহকর্মী ছিলেন।

অন্যদিকে, রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপু জানান, তিনি মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না এবং দলে কোনো কোন্দল নেই।

খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া অবশ্য পাহাড়িদের বাদ দিয়ে সমতল থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন।

দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমার আলোচনার পক্ষে ছিলেন বলেও জানা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা

পদত্যাগের বিষয়ে দীপেন দেওয়ান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাঁর আস্থা আছে এবং তিনি বিষয়টি বুঝতে পারবেন।

তিনি জানান, দলের স্বার্থকে তিনি বড় করে দেখেন এবং মন্ত্রী না থাকলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার স্বার্থ দেখবেন।

তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এম. আর. হোসাইন জানান, সোমবার তিনি বাসা থেকে কোথাও যাননি এবং তাঁর মন খারাপ ছিল।

২০০৫ সালে যুগ্ম জজের চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া দীপেন দেওয়ানের বাবা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।

২০০৮ সালে সরকারি চাকরির বাধ্যবাধকতায় তিনি নির্বাচন করতে না পারায় তাঁর স্ত্রী মৈত্রী চাকমা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

রাঙামাটিতে বিক্ষোভ

পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাঙামাটিতে দীপেন দেওয়ানের অনুসারীরা শহর অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

সোমবার বিকেল ৫টা থেকে শহরের কাঁঠালতলীতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এই অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, মন্ত্রী শারীরিকভাবে অসুস্থ নন এবং তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগ করানো হয়েছে।

কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাজামং মারমাও একই দাবি করেছেন।

রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমন মনে করেন, দীপেন দেওয়ানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

অবিলম্বে এই পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে তাঁকে স্বপদে বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।