
একটি প্রতিবেদন। তারপর একটি তদন্ত। তারপর একটি পরিবর্তন।
এই সরল সমীকরণই হলো প্রকৃত সাংবাদিকতার শক্তি। সংবাদ কেবল ঘটনার বিবরণ নয়- এটি একটি হস্তক্ষেপ। সমাজের অসঙ্গতিতে আলো ফেলা, ক্ষমতাবানের দিকে আঙুল তোলা, নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া।
মে মাসে (২০২৬) একুশে পত্রিকার মাঠপর্যায়ের পাঁচজন সংবাদকর্মী ঠিক সেই কাজটিই করেছেন। ভূমি অফিসের দুর্নীতি থেকে পাহাড়ের আঙুর বাগান- প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের কলম এনেছে বাস্তব পরিবর্তন, ছুঁয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন।
তাঁদের সেই সাহসী সাংবাদিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ একুশে পত্রিকা ঘোষণা করেছে মে মাসের ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’।
সেরা সাংবাদিক জিন্নাত আয়ুব: পেন্সিলের বিরুদ্ধে কলমের লড়াই
আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিস। একজন অসহায় নারী। আর একটি অস্থায়ী অপারেটরের ‘পেন্সিল-জাদু’- যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে পেন্সিলে লেখা হয়, যাতে প্রয়োজনমতো মুছে ফেলা যায়।
আনোয়ারা-কর্ণফুলী প্রতিনিধি জিন্নাত আয়ুব গত ৬ মে এই অনিয়ম উন্মোচন করলেন তাঁর প্রতিবেদনে: ‘আনোয়ারা ভূমি অফিসের পেন্সিল-কারসাজি: কে লিখল, কার স্বার্থে?’ খবরটি প্রশাসনে পাথর ছুড়ল।
কিন্তু জিন্নাত থামলেন না। ১৩ মে এলো দ্বিতীয় প্রতিবেদন: ‘আনোয়ারা ভূমি অফিসে পেন্সিল-জাদু, এডিসিকেও তোয়াক্কা করেন না অপারেটর।’ প্রশাসনের বড় কর্মকর্তাকেও পরোয়া করে না সেই অপারেটর-এই সাহসী তথ্য প্রকাশ করলেন তিনি।
১৮ মে তৃতীয় প্রতিবেদন: ‘পেন্সিলের বিরুদ্ধে কলম: একটি প্রতিবেদন যেভাবে নাড়িয়ে দিল প্রশাসনকে।’ এবার নড়ল বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর। শুরু হলো আনুষ্ঠানিক তদন্ত।
কিন্তু জিন্নাতের মে মাস কেবল এখানেই শেষ নয়।
গত ২৭ এপ্রিলের প্রতিবেদন ‘৫৮৪ কোটির প্রকল্পে স্থবিরতা: চাতরী চৌমুহনীতে সামান্য বৃষ্টিতেই কৃত্রিম বন্যা’ প্রকাশের পর ২ মে দেখা গেল ড্রেন নির্মাণ শুরু হয়েছে। প্রশাসন নেমেছে মাঠে। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় কষ্ট পাওয়া মানুষগুলো পাচ্ছেন একটু স্বস্তি।
এছাড়া সড়ক ও জনপথের গাইড ওয়াল কেটে অবৈধ সেতু নির্মাণের প্রতিবেদনের পর ৭ মে প্রশাসন সেই সেতু সরানোর আদেশ দিয়েছে, জরিমানা করেছে ২৫ হাজার টাকা।
তিনটি আলাদা ইস্যুতে তিনটি সরাসরি পরিবর্তন। তাই মে মাসের সেরা সাংবাদিক হিসেবে ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন জিন্নাত আয়ুব।
স্পেশাল ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড: চার কলমসৈনিকের চার গল্প
ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ: ওষুধ পৌঁছাল ৩০ ক্লিনিকে
মহেশখালীর ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিক। ওষুধ নেই। চিকিৎসাসামগ্রী নেই। দরিদ্র মানুষ আসছেন, ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে।
মহেশখালী প্রতিনিধি ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ গত ৭ মে (অনলাইন) ও ১১ মে (প্রিন্ট) এই সংকটের ছবি তুলে ধরলেন: ‘পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী ও ওষুধের তীব্র সংকট, অচল মহেশখালীর ৩০টি ক্লিনিক।’
স্বাস্থ্য বিভাগের টনক নড়ল। মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুততম সময়ে পাঠানো হলো মেডিসিন কিট ও ২২ ধরনের ওষুধ। ১৬ মে ফলোআপ প্রতিবেদনে শিরোনাম হলো: ‘ওষুধ পেল মহেশখালীর ৩০ কমিউনিটি ক্লিনিক।’
৩০টি ক্লিনিক মানে হাজার হাজার রোগী। সেই রোগীদের মুখের হাসিই ফুয়াদের সাংবাদিকতার পুরস্কার।
মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: এক মাসে তিন খাতে তিন জয়
সাতকানিয়া প্রতিনিধি মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন এ মাসে যা করেছেন, তা রীতিমতো হ্যাটট্রিক।
গত ২৫ মে সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকটের খবর প্রকাশ করলেন। পরদিন ২৬ মে সেখানে হাজির এমপি ও সিভিল সার্জন। একটি প্রতিবেদন, তারপর মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রশাসনের সর্বোচ্চ মনোযোগ।
পাহাড় কেটে মাটি ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবেদনের ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় কলম ধরে তিনি প্রমাণ করেছেন, সাংবাদিকতাও পরিবেশ আন্দোলনের হাতিয়ার হতে পারে।
আর গত ১৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনের জেরে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে ১০টি হর্ন জব্দ ও জরিমানা আদায় হয়েছে।
তিনটি ভিন্ন ইস্যু। তিনটি সফল হস্তক্ষেপ। এটিকেই বলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রকৃত মাপকাঠি।
এস এম আক্কাছ: জনগণের টাকার হিসাব নিলেন
ফটিকছড়িতে ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকার সড়ক প্রকল্প। কিন্তু কাজে নিম্নমানের সামগ্রী। জনগণের কর কোথায় যাচ্ছে?
ফটিকছড়ি প্রতিনিধি এস এম আক্কাছ গত ২২ মে সেই প্রশ্ন তুললেন প্রতিবেদনে। প্রশাসন নড়েচড়ে বসল। ঠিকাদারকে বাধ্য করা হলো পুরনো ও নিম্নমানের খোয়া অপসারণ করে নতুনভাবে কাজ শুরু করতে।
এটি কেবল একটি সড়কের গল্প নয়। এটি জনগণের অধিকার আদায়ের গল্প।
জাকির হোসেন: পাহাড়ে জাগালেন নতুন স্বপ্ন
খাগড়াছড়ির পাহাড়চূড়ায় ইউক্রেনের আঙুর চাষ করছেন একজন কৃষক। দীঘিনালা প্রতিনিধি জাকির হোসেন গত ৫ এপ্রিল এই অসাধারণ উদ্যোগের গল্প বললেন: ‘পাহাড়ের চূড়ায় ইউক্রেনের আঙুর।’
গল্পটি পৌঁছাল কৃষি বিভাগের কাছে। ১২ মে কৃষি কর্মকর্তারা নিজেরাই গেলেন বাগানে। পরীক্ষা করলেন আঙুরের মিষ্টতা। দিলেন গ্রিনহাউস তৈরির প্রতিশ্রুতি।
একটি কৃষকের স্বপ্নকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সাথে জুড়িয়ে দিয়েছেন জাকির। এটি শুধু একজন কৃষকের গল্প নয়-এটি পাহাড়ি জনপদে উচ্চমূল্যের ফল চাষের নীরব বিপ্লবের সূচনা।
সম্পাদকের কথা
একুশে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নজরুল কবির দীপু বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। পাঠকদের আস্থাই আমাদের প্রেরণা। আগামীতেও সমাজের প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আমাদের এই ‘ইমপ্যাক্ট’ যাত্রা অব্যাহত থাকবে।”
পাঁচজন সাংবাদিক। পাঁচটি আলাদা গল্প। কিন্তু একটি অভিন্ন সত্য।
সাংবাদিকতা তখনই সার্থক, যখন একটি প্রতিবেদন পরিবর্তন আনে। যখন একজন অসহায় নারীর ভূমি অফিসের ফাইল ছাড়া পায়। যখন মহেশখালীর দরিদ্র রোগী ওষুধ পান। যখন পাহাড়ের কৃষক সরকারি সহায়তা পান।
এই পাঁচজন এই মাসে ঠিক সেই কাজটিই করেছেন।
তাঁদের জন্য অভিনন্দন। তাঁদের কলম অব্যাহত থাকুক।
