ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি মনির, প্রত্যাহারের দাবি


কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর ছবি তুলে থানার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশের অভিযোগ উঠেছে।

আজ মঙ্গলবার দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, গতকাল সোমবার রাতে ছবিটি পোস্ট করার পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

জানা গেছে, সম্প্রতি চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে এক ব্যক্তিকে পেটানোর ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় প্রত্যাহার করা হয়। ওই ঘটনার নেপথ্য নির্দেশদাতা হিসেবে ওসি মনির হোসেনের অপসারণের দাবি ওঠে। সেই জনদৃষ্টি সরাতেই তিনি এ অপকৌশলের আশ্রয় নেন বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঈদগাঁও উপজেলার এক কিশোরীর সঙ্গে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ছাইরাখালী এলাকার নুরুল আমিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ছেলের পরিবারের দাবি, ওই সম্পর্কের জেরে মেয়েটি নুরুল আমিনের বাড়িতে চলে আসে।

তবে কিশোরীর বাবার অভিযোগ, গত ২৮ মে তার মেয়েকে অপহরণ করা হয়। এরপর তিনি থানায় মামলা করেন। ৩০ মে পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধার করে এবং নুরুল আমিনকে আটকের পর ছেড়ে দেয় পুলিশ।

মেয়েটিকে দুই দিন আটকে রেখে নুরুল আমিন ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সদর হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এর আগে নুরুল আমিনকে মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এসআই মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনসে যুক্ত করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, আলোচিত এই ঘটনার মোড় ঘোরাতেই ওসি মনির হোসেন নিজের রুমে কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে ছবি তোলেন এবং তা থানার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। সমালোচনার মুখে পরে পেজটি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়।

শুধু ছবি নয়, সমালোচনাকারীদের জবাব দিতে কিশোরীর ছবির সঙ্গে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাসও জুড়ে দেন ওসি মনির হোসেন। এছাড়া সমালোচনা করায় স্থানীয় সাংবাদিকদেরও তিনি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ইসুফ বিন হোসেন ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, একজন ১৪ বছরের কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে ছবি তুলে বিবৃতি দেওয়া কি বেশি জরুরি ছিল? ওড়না পাশের সোফায় রেখে ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়া অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।

আইন অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর ছবি বা পরিচয় প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ ধারা অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা জানান, সদর হাসপাতালে তার মেয়ের ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে। তবে ফেসবুকে মেয়ের ছবি প্রকাশের বিষয়ে ওসি মনির হোসেন তার বা তার স্ত্রীর কোনো অনুমতি নেননি।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, আইনের রক্ষক হিসেবে ওসি মনির হোসেনের এমন আচরণ দুঃখজনক এবং সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, ভিকটিমের ছবি প্রচার করা আইন পরিপন্থি কাজ। তিনি ওসি মনির হোসেনের সঙ্গে কথা বলবেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে এলে পুলিশ সুপার ও তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ওসি মনির হোসেনকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান জানান, বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন এবং দ্রুত জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।