পাঁচ ভাষায় শুরু, একটি অঙ্গীকারে শেষ: দীপেন দেওয়ানের বার্তা কী বলে?


রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—তিন পার্বত্য জেলায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। রাস্তায় মিছিল, সমাবেশে স্লোগান, সামাজিক মাধ্যমে ঝড়। কারণ একটাই—পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন।

গত সোমবার (১ জুন) দুপুরে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। তারপর থেকে দুই দিন ধরে চুপ। অনুসারীরা উদ্বিগ্ন, বাইরে নানা জল্পনা-কল্পনা। কিন্তু তিনি কিছু বলছিলেন না।

মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পরামর্শকেরা তাঁকে চুপ থাকতে বলেছিলেন। সেই পরামর্শ মেনে তিনি নীরব ছিলেন।

অবশেষে বুধবার (৩ জুন) রাতে নীরবতা ভাঙলেন। ফেসবুকে দিলেন একটি দীর্ঘ পোস্ট।

পাঁচটি ভাষায় শুরু, শান্তির আহ্বান

পোস্টটি শুরুই হলো ভিন্নভাবে। বাংলায় ‘আসসালামালাইকুম’-এর পাশাপাশি লিখলেন পাহাড়ের মানুষের ভাষায়—’ঝু ঝু’, ‘নমস্কার’, ‘কুলুংকা’, ‘রিকোবায়া’।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি। পাঁচটি ভাষায় অভিবাদন জানিয়ে দীপেন দেওয়ান বললেন—এই ভূমি সবার।

তারপর সরাসরি মূল বিষয়ে এলেন: “সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে আমার পদত্যাগকে কেন্দ্র করে তিন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যে আবেগ, উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে আমি গভীরভাবে অবগত রয়েছি।”

এরপর আহ্বান জানালেন শান্তির: “আপনারা শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধারণ করুন এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখুন। কোনো ধরনের উসকানি, বিভ্রান্তি বা সংঘাতের পথে যাবেন না।”

বাবার উত্তরাধিকার, দলের প্রতি অঙ্গীকার

পোস্টে দীপেন দেওয়ান তুললেন তাঁর বাবার কথা। বাবা সুবিমল দেওয়ান শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই পরিবার থেকেই রাজনীতিতে আসা, সেই আদর্শ বুকে ধারণ করে পথ চলা।

তিনি লিখলেন: “তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা আমার রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণা।”

এরপর স্পষ্ট ঘোষণা: “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আমার রাজনৈতিক আদর্শের ঠিকানা। আমি জীবনের অবশিষ্ট সময়ও এই প্রিয় দলের আদর্শে নিজেকে উৎসর্গ করে যেতে চাই। এই দল আমি কখনো ত্যাগ করব না।”

পোস্টের শেষে লিখলেন আরও স্পষ্ট করে: “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আমি পূর্ণ আস্থাশীল। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চাই।”

এবং শেষ করলেন দীপ্ত ঘোষণায়: “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আমার শেষ ঠিকানা।”

পাহাড়ের সন্তান, পাহাড়ের জন্য স্বপ্ন

পোস্টে দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথাও বললেন।

“পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সবার। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার।”

পাহাড়ি-বাঙালি বিভেদ নয়, ঐক্যের কথা বললেন: “পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা আরও সুদৃঢ় হোক—এটাই আমার প্রত্যাশা।”

তিনি যোগ করলেন: “মত-পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু বিভেদ নয়। প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু সংঘাত নয়।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় দশকের পর দশক ধরে যে অস্থিরতা, যে বিভেদ—সেই প্রেক্ষাপটে এই কথাগুলো কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি একটি অঞ্চলের সন্তানের হৃদয়ের কথা।

পরিচয়: রাঙামাটির রাঙাপানির সন্তান

দীপেন দেওয়ান ১৯৬৩ সালের ৮ জুন রাঙামাটির রাঙাপানি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা সুবিমল দেওয়ান জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা দীপেন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগদান করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য রাঙামাটি আসন থেকে দুই লাখ এক হাজার আটশো চৌচল্লিশ ভোট পেয়ে জয়ী হন।

সেই জনপ্রতিনিধিই এখন মন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন। কিন্তু ফেসবুকের পোস্টে স্পষ্ট করলেন—রাজনীতি ছাড়েননি, দল ছাড়েননি, পাহাড়ের মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ছাড়েননি।

নীরব প্রশ্ন

পোস্টের পর তাঁর মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।

‘অসুস্থতার কারণে’ পদত্যাগ—এই কারণটি নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরছে রাজনৈতিক মহলে। সত্যিই কি শুধু অসুস্থতা? নাকি আরও কোনো কারণ আছে?

দীপেন দেওয়ান সেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন—তিনি দলে আছেন, থাকবেন, পাহাড়ের মানুষের জন্য কাজ করতে চান।

বাকিটা সময় বলবে।