বন্ধ কারখানার চিমনিতে আবার ধোঁয়া উঠবে?


একসময় কর্মচাঞ্চল্যে মুখর ছিল কারখানাটি। সকাল হলেই শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। উৎপাদনের শব্দে কাঁপত মেঝে, চলত মালামাল ওঠানামা। কিন্তু একসময় চলতি মূলধনের সংকটে থমকে যায় সবকিছু। নিভে যায় চিমনির ধোঁয়া, বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন, অনিশ্চয়তায় পড়ে হাজারো শ্রমিকের জীবন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এমন অসংখ্য শিল্প ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। যন্ত্রপাতি আছে, বাজার আছে, দক্ষ জনবলও আছে—কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় অর্থ। সেই স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদনের চাকা আবার ঘোরাতে এবার ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগকে অনেকেই দেশের শিল্পখাত পুনরুজ্জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

কেন এই তহবিল?

গত কয়েক বছরে উচ্চ সুদহার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো শিল্পখাতে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে ঋণ নিতে সাহস পায় না।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বন্ধ ও আংশিক সচল শিল্প-সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠন করেছে। এখান থেকে ব্যাংকগুলো মাত্র ৪ শতাংশ সুদে অর্থ পাবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে তুলনামূলক কম সুদের এই অর্থায়ন শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।

কারা পাবেন এই সুবিধা?

সব প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের আওতায় আসবে না।

অগ্রাধিকার পাবে এমন বৃহৎ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি রয়েছে কিন্তু শুধুমাত্র চলতি মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

রপ্তানিমুখী শিল্প, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ কোনো উদ্যোক্তা যদি বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করতে চান, তারাও অগ্রাধিকার পাবেন।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক—ঋণখেলাপি, অর্থপাচারে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং ঋণের অর্থ অপব্যবহারের ইতিহাস আছে এমন কেউ এই সুবিধা পাবে না।

সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা

নীতিমালা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।

এই অর্থ দিয়ে চার মাস পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা যাবে।

তবে পুরোনো ঋণ শোধ বা দায় সমন্বয়ের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ এটি কেবল উৎপাদন ও ব্যবসা সচল করার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। প্রয়োজনে ব্যবহার ও পরিশোধের ভিত্তিতে তা নবায়ন করা যাবে। গ্রাহকরা প্রথম ছয় মাস কোনো সুদের কিস্তি পরিশোধ না করেও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবেন।

শুধু ঋণ নয়, থাকবে কঠোর নজরদারি

বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন তহবিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদনের পরিবর্তে অর্থ অন্য খাতে চলে যাওয়ার অভিযোগও ছিল।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার নজরদারিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঋণগ্রহীতাকে সব ধরনের ব্যবসায়িক আয়-ব্যয় একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। শ্রমিকদের বেতন সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠাতে হবে; কোনো নগদ লেনদেন করা যাবে না।

ব্যাংকগুলোকে প্রতি সপ্তাহে বিক্রয় বা রাজস্ব প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর কারখানা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগও করতে পারবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সময় সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঋণের ব্যবহার যাচাই করতে পারবে।

অর্থনীতি কি গতি পাবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, দেশের বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ শিল্প সক্ষমতা এখনো অলস পড়ে আছে। অনেক কারখানায় যন্ত্রপাতি রয়েছে, কিন্তু উৎপাদন নেই। ফলে কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কারখানা স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান কিন্তু বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করা তুলনামূলক দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল। কারণ সেখানে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং বাজার সংযোগের একটি ভিত্তি আগে থেকেই থাকে।

যদি এই তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সাফল্যের চাবিকাঠি কোথায়?

তহবিলের আকার বড়, সুদের হার কম এবং শর্তও তুলনামূলক সহনশীল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে অর্থ কতটা স্বচ্ছভাবে বিতরণ ও ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যতিক্রমী বার্তাও দিয়েছে—এই স্কিমের আওতায় ঋণের সঠিক ব্যবহার করে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হবে।

এটি শুধু একটি ঋণ কর্মসূচি নয়; বরং বন্ধ কারখানার গেট খুলে দেওয়া, উৎপাদনের চাকা ঘোরানো এবং কর্মহীন মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালানোর একটি প্রচেষ্টা।

এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পের চিমনিগুলোতে সত্যিই আবার ধোঁয়া ওঠে কি না।