
দেশের কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শরীফুল রুকন। অনলাইন পত্রিকা ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেছেন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপের এই অনন্য উদ্যোগে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন ক্যাটাগরিতে মোট সাতজন প্রতিভাবান সাংবাদিককে পুরস্কৃত করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রিন্ট বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন দ্য ডেইলি স্টারের স্টাফ রিপোর্টার সুকান্ত হালদার, দ্য ডেইলি সানের রফিকুল ইসলাম ও এম মুনির হোসেন। টেলিভিশন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন চ্যানেল ২৪-এর দেলাওয়ার হোসেন দোলন এবং একাত্তর টিভির রাকিব হোসেন। অনলাইন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন একুশে পত্রিকা ডটকমের শরীফুল রুকন ও জাগো নিউজ২৪-এর নাজমুল হোসেন।
এর মধ্যে ঢাকার বাইরের সাংবাদিক হিসেবে একমাত্র শরীফুল রুকনই এই সম্মানজনক পুরস্কার জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) কনফারেন্স রুমে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও পুরস্কার তুলে দেন।
কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাত থেকে সরকারের ২৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের স্বপ্নের বিপরীতে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র নিয়ে শরীফুল রুকনের পাঁচটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনগুলোর জন্যই তিনি পুরস্কারটি অর্জন করেছেন।
প্রতিবেদনগুলোতে কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল কেন কারখানার কাঁচামাল হতে পারছে না, প্যাকেজিংয়ের ভুলে হাতছাড়া হওয়া বিলিয়ন ডলারের বাজার, আস্থার সংকটে ডুবতে থাকা হাজার কোটি টাকার রপ্তানি খাত, চিংড়ির কারখানায় তালা ঝোলার পেছনের কারণ ও কাদা-পানির নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদ এবং ২৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নীতিমালার জটের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।
একুশে পত্রিকায় প্রকাশিত শরীফুল রুকনের কাজ জুরি বোর্ডের বিচারক ও আয়োজকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জুরি বোর্ডের অন্যতম সদস্য ও বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার খুরশিদ আহমেদ ফরহাদ রুকনের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের একটি পত্রিকার এমন উদ্ভাবনী সংবাদ শুধু কৃষি অর্থনীতি নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখতে পারে।
এ ধরনের সাংবাদিকদের খুঁজে বের করে পরিচর্যা করলে সাংবাদিকতা আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত মন্ত্রী ও নেতৃস্থানীয় সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

জুরি বোর্ডের আরেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসও ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের অভাবনীয় কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, নিউজের কত গভীরে কে ঢুকতে পারল, মূলত সেই দিকটিই তারা বিবেচনা করেছেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রতিবেদনগুলোকে অত্যন্ত উদ্ভাবনী, সৃজনশীল ও সময়োপযোগী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সাংবাদিকদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা এই চ্যালেঞ্জগুলো আগামী দিনে নীতিনির্ধারক ও স্টেকহোল্ডারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ডকুমেন্ট হিসেবে কাজে লাগবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হাসান হাফিজ তৃণমূল পর্যায়ের সাংবাদিকদের অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের উৎসাহিত করতে এ ধরনের পুরস্কারের পরিধি বিভাগীয় পর্যায়ে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক এবং জুরি বোর্ডের সদস্য মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের কাজের প্রশংসার পাশাপাশি কিছু গঠনমূলক সমালোচনা তুলে ধরেন। তিনি তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও প্রাণ গ্রুপকে এমন প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরির জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জমা পড়া প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে বেশ কিছু কাজ ছিল অসাধারণ। তবে একই রিপোর্ট প্রায় একই শব্দচয়ন ও তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে ছাপানোর সমালোচনা করেন তিনি। যদিও জুরি বোর্ডের আরেক সদস্য খুরশিদ আহমেদ ফরহাদ স্পষ্ট করেন যে, একই প্রতিবেদন বিভিন্ন নামে ছাপানোর বিষয়টি মূলত প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছে।
বিচারপ্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম আরও একটি ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কিছু কিছু প্রতিবেদন শুরুতে খুব ভালো হলেও একটা পর্যায়ে গিয়ে তা দিক হারিয়ে ফেলেছে এবং মূল বিষয়ের সাথে শেষ পর্যন্ত মিল রাখা হয়নি। প্রতিবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিল্পের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা, খাদ্যের নিরাপত্তা ও গুণগত মানকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। সবার অভিজ্ঞতা থেকে আগামী দিনগুলোতে আরও ভালো রিপোর্টিং ও মানসম্মত এন্ট্রি পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শরীফুল রুকনের এই অর্জন একুশে পত্রিকার বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতিশ্রুতিরই একটি বড় প্রমাণ। এর আগেও তিনি টিআইবি থেকে ফেলোশিপ ও টানা দুই বছর ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার’, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, টানা তিনবার ব্র্যাক মাইগ্রেশন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ‘গণমাধ্যম পুরস্কার’ লাভ করেছেন। ২০২৩ সালে তার একটি প্রতিবেদন গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক (জিআইজেএন) কর্তৃক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিল।
