‘আইনজীবীর পরামর্শে’ আদালত অমান্য, পুলিশের মুচলেকায় পার পেলেন ‘ভূমিদস্যু’


চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী মৌজায় আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিরোধপূর্ণ জমিতে জোরপূর্বক বালু ভরাটের চেষ্টা চালিয়েছেন দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি। খবর পেয়ে আনোয়ারা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইমাম হোসেন ঘটনাস্থল থেকে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসেন। তবে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই সাদা কাগজের মুচলেকায় স্থানীয় কয়েকজনের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে তীব্র আলোচনা ও প্রশ্নের ঝড় উঠেছে।

বিরোধের পটভূমি

বটতলী মৌজার আরএস ১৮৯০/১৮৯১ নম্বর দাগ এবং বিএস ৩৮৮৮/৩৮৮৯ নম্বর দাগাধীন প্রায় ৫১ শতক নাল জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। ওই জমিতে আদালতের বিধিনিষেধ বহাল থাকা সত্ত্বেও দেলোয়ার হোসেন বালু ভরাটের মাধ্যমে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান।

নিষেধাজ্ঞার বাদী অ্যাডভোকেট সালাউদ্দীন আহমদ চৌধুরী জানান, তার এক ভাই ওই দাগ নম্বর উল্লেখ করে ভিন্ন দাগের জমি বুঝিয়ে দিয়ে দেলোয়ারের কাছে বিক্রি করেছিলেন। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ করে দেলোয়ার বিরোধীয় দাগে দখল নেওয়ার চেষ্টা শুরু করলে তারা আদালতের আশ্রয় নেন।

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “দেলোয়ার বারবার আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমি দখলের চেষ্টা করছেন। এবারও একই পথে হাঁটলেন। থানায় নেওয়ার পরও এভাবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো কেন, তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।”

অ্যাডভোকেট চৌধুরী আরও অভিযোগ করেন, দেলোয়ার একজন পেশাদার ভূমিদস্যু। এক দাগের সামান্য অংশ কিনে পুরো দাগ দখলে নেওয়াই তার কৌশল। তার বিরুদ্ধে একাধিক ভূমি মামলার পাশাপাশি একটি ধর্ষণ মামলাও বিচারাধীন রয়েছে বলে তিনি জানান।

অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি

বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন নিজেই আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সত্য। তবে আমার উকিল বলেছিলেন, এটি পুনরায় নিষেধাজ্ঞা হয়েছে, কখন শেষ হবে ঠিক নেই- তাই ভরাট করে দখলে নিয়ে নিন। উকিলের পরামর্শেই কাজ করেছিলাম, যা আমার ভুল হয়েছে। পরে এসআই সাহেবের কাছে ভুল স্বীকার করে মুচলেকা দিয়েছি।”

পুলিশের ভূমিকা ও জিম্মাদারি

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এসআই ইমাম হোসেন জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর দেলোয়ারকে থানায় এনে আইন হাতে না নেওয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়। পরে স্থানীয় কয়েকজনের জিম্মায় এই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতিতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

থানা সূত্রে জানা গেছে, দেলোয়ারকে জিম্মায় নেন নুরুল আলম, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, মোশারফ হোসেন, মো. শাহাবুদ্দিন এবং মো. হারুনুর রশিদ।

জিম্মাদার শাহাবুদ্দিন বলেন, “আইন সবার জন্য সমান। তবে দেলোয়ার আমাদের আত্মীয় হওয়ায় তাকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় গিয়েছি।”

তবে এক রহস্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় আরেক জিম্মাদার রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে। তিনি প্রথমে নিজের পরিচয় স্বীকার করলেও জিম্মাদারির বিষয়ে প্রশ্ন করা মাত্রই “এসব কিছুই জানি না” বলে ফোন কেটে দেন। অথচ থানার কাগজে তার নাম ও মোবাইল নম্বর স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে।

আদালতের আদেশ অমান্যের মতো সুস্পষ্ট অপরাধে জড়িত একজন ব্যক্তিকে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে সাদা কাগজের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন উঠছে।