
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রায়ই দুই ইঞ্জিনের বিমানের সঙ্গে তুলনা করা হয়- এক ইঞ্জিনে পোশাক রপ্তানি, আরেক ইঞ্জিনে প্রবাসী আয়। দীর্ঘদিন ধরে দুটো ইঞ্জিনই কমবেশি চলছিল। কিন্তু আজ একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কি দ্বিতীয় ইঞ্জিনটিও শক্তি হারাতে বসেছে?
চট্টগ্রাম থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বিদেশ পাড়ি দেন স্বপ্ন নিয়ে- পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, একটু ভালো থাকার স্বপ্ন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত- এই নামগুলো চট্টগ্রামের প্রতিটি অলিগলির পরিচিত শব্দ। গেলো বছর চট্টগ্রাম জেলা থেকে ডাটা ব্যাংকে নাম নিবন্ধন করেছেন ৬৮ হাজার ১৫৪ জন, কিন্তু বিদেশ যেতে পেরেছেন মাত্র ৪১ হাজার ৮২৯ জন। চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে নিবন্ধন করেছেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ, গেছেন মাত্র দশ হাজারের মতো। বাকি মানুষগুলো কোথায় গেছেন? তারা বাড়িতে বসে আছেন- স্বপ্ন বুকে নিয়ে, পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
সারাদেশের চিত্রও ভিন্ন নয়। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বিদেশ গেছেন ১৩ লাখ শ্রমিক। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১০ লাখ ১০ হাজারে, এক বছরে পতন প্রায় ২২ শতাংশ। অথচ করোনামহামারির বছর ২০২২-এও এর চেয়ে বেশি মানুষ বিদেশ গেছেন। পরিসংখ্যান যতটুকু বলে, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
তবু একটি বিষয় বিস্ময়কর। জনশক্তি রপ্তানি কমলেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে রেকর্ড ৩০.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই বৈপরীত্য কীভাবে সম্ভব? উত্তর লুকিয়ে আছে হুন্ডির অন্ধকার জগতে। আগে যে অর্থ অপ্রাতিষ্ঠানিক পথে দেশে আসত, এখন তার একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে। অর্থাৎ আয় বাড়েনি, শুধু পথ বদলেছে। এই সাময়িক স্বস্তিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য ভাবলে ভুল হবে।
আসল সংকটটা অন্য জায়গায়। মধ্যপ্রাচ্যের ৭৫ শতাংশ নিয়োগকারী দেশ বাংলাদেশি শ্রমিকের কারিগরি দক্ষতার ওপর আস্থা রাখে না। ফলে ভালো বেতনের কাজ যায় ভারত বা নেপালের দক্ষ শ্রমিকের কাছে, আর আমাদের মানুষ পড়ে থাকেন নিম্নমানের নিম্ন আয়ের কাজে। এর পরিণতি কেবল কম রেমিট্যান্স নয়, মানবিক বিপর্যয়ও। ২০২৪ সালে ‘আউটপাস’ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ৫০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। এঁরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে গিয়েছিলেন, ফিরে এসেছেন খালি হাতে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঠামোগত বাধা। সৌদি আরব তাদের ‘ভিশন ২০৩০’ অনুযায়ী শ্রমবাজারে ৭০ শতাংশ সৌদি নাগরিক অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ‘সৌদিকরণ কর্মসূচি’র আওতায় প্রবাসীদের জন্য ১২ ধরনের চাকরি ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি দীর্ঘদিন প্রায় বন্ধ। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসন ২০২৩ সালের ১০ হাজার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৫৫০-এ নেমে এসেছে। ইতালিতে সংখ্যাটি ১৬ হাজার ৮৭৯ থেকে মাত্র ১ হাজার ১৬৪-তে ধসে পড়েছে। দরজাগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে, আর আমরা নতুন দরজা খোলার বদলে পুরনো দরজায় ধাক্কা দিতেই ব্যস্ত।
এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন উদ্বেগ যোগ করেছে। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লাগবে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত কি?
সমস্যাটা কেবল বাইরের নয়, ভেতরেও। প্রবাসীরা কষ্টের টাকা পাঠান, কিন্তু ব্যাংকের বিনিময় হার আর বাজারের বিনিময় হারের মধ্যে ফারাক থাকলে হুন্ডি বন্ধ হয় না। আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হুন্ডি ঠেকানো যাবে না, বরং বাজারসম্মত বিনিময় হার নিশ্চিত করাটাই টেকসই সমাধান।
তাহলে পথ কোথায়? উত্তর একটাই- দক্ষতা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর অটোমেশনের দাপটে অদক্ষ শ্রমের বাজার প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে। আজ যে দেশ আমাদের শ্রমিক নেয়, কাল সে দেশ মেশিন বসাবে। তখন দক্ষ জনশক্তিই টিকবে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে আমরা কী করলাম? সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কতটুকু আধুনিক দক্ষতা তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের জবাব আমাদের কাছে নেই।
পাশাপাশি দরকার শ্রমবাজার বৈচিত্র্যায়ন। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া- এই বাজারগুলো ধরতে পারলে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে। কিন্তু সেই বাজার ধরতে হলে চাই দক্ষ শ্রমিক, চাই সক্রিয় কূটনীতি, চাই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি।
সংকটকে স্বীকার না করলে সমাধান হয় না। আমাদের দুই ইঞ্জিনের একটি এখন কাঁপছে। এখনই সময় মেরামতের, নইলে বিমানটি কোথায় গিয়ে নামবে, সেই দায় আমাদের সবাইকেই বহন করতে হবে। লাখো প্রবাসীর ঘাম আর স্বপ্নের এই অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, নীতিনির্ধারকদের এবং আমাদের সবার।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
