পাহাড় চিড়ে তৈরি হচ্ছে ৪ সড়ক: জঙ্গল সলিমপুরের চিত্র বদলাচ্ছে সেনাবাহিনী


ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য খ্যাত চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সড়ক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দুর্গম এই এলাকাটিকে রোড নেটওয়ার্কের আওতায় আনার ঘোষণার পর চারটি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সড়কগুলো নির্মিত হলে খুব সহজেই জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করা যাবে। এর ফলে পুরো এলাকাটি প্রশাসনের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের আওতাধীন ২৬ ইসিবি গত ৪ জুন থেকে এই কাজ শুরু করেছে। প্রকল্পে মোট ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ চারটি সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি তিনটি সেতু, কয়েকটি কালভার্ট এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। সড়ক নির্মাণকাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা দিচ্ছে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাব।

সোমবার (৮ জুন) জঙ্গল সলিমপুরে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সড়ক নির্মাণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (ইসিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ কামরুল আলম মাসুদ।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ কামরুল আলম মাসুদ জানান, প্রথম পর্যায়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর বিদ্যালয় থেকে ভাটিয়ারি-হাটহাজারী লিংক রোড পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ মিটার দীর্ঘ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান রাস্তাটি প্রশস্ত করা ও মাটি কাটার কাজ চলছে। ১৮ ফুট প্রস্থের এই সড়কে পাহাড়ধস রোধে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। পুরো কাজ শেষ করতে অন্তত আট মাস সময় লাগতে পারে।

সড়কগুলোর রুট সম্পর্কে তিনি জানান, প্রথম ধাপে ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মিত হবে। এরপর আলীনগর-টেক্সটাইল হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত একটি সড়ক, আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) পাশ দিয়ে ভাটিয়ারি-বালুচড়া লিংক রোড হয়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে সংযুক্ত তৃতীয় একটি সড়ক এবং জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরে চলাচল সহজ করতে আরও একটি সড়ক তৈরি করা হবে।

বর্ষা মৌসুমেও নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকবে জানিয়ে ২৬ ইসিবির এই অধিনায়ক বলেন, পাহাড়ি এলাকায় বর্ষায় কাজ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রথম ধাপে মাটি কেটে রাস্তার ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে। বৃষ্টির পানি পেলে সেই মাটিতে শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠবে এবং সড়কটি আরও টেকসই হবে।

২৬ ইসিবির কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ না থাকলেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশেই এই প্রকল্প শুরু হয়েছে।

প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রির মাধ্যমে চিহ্নিত ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র জঙ্গল সলিমপুরকে ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে। লাখো মানুষের বসবাস থাকা এই দুর্গম এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার বাধার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এর আগে গত ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যান। সে সময় তিনি সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়ন, ভাটিয়ারি ও হাটহাজারী বাইপাস হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত রোড নেটওয়ার্ক তৈরির ঘোষণা দেন। তবে আপাতত সেখানকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছিলেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এলাকাটি এতদিন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও ভূমিদস্যুদের দখলে ছিল। সড়কগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ হবে।