
ফুটবল শুধু একটি সাধারণ খেলা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ এবং কান্নার এক মহাকাব্য। যুগের পর যুগ ধরে এই খেলায় অসংখ্য প্রতিভার জন্ম হয়েছে, তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে এমন দশজন ফুটবলার আছেন, যারা সর্বকালের সেরা বা ‘গোট’ হিসেবে চিরস্থায়ী স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই দশজন কিংবদন্তি মহাতারকা হলেন পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ইয়োহান ক্রুইফ, জিনেদিন জিদান, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার এবং আলফ্রেডো ডি স্টিফানো।
পেলে– ফুটবলের অবিসংবাদিত ‘রাজা’
পেলে দুই পায়ে সমান দক্ষ ছিলেন এবং অসাধারণ ড্রিবলিং ও শূন্যে লাফিয়ে হেড করার ক্ষমতায় পারদর্শী ছিলেন। ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা ব্রাজিলের সান্তোস ক্লাবে কাটালেও শেষে নিউইয়র্ক কসমসে খেলেছেন। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে তাঁর তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করে তিনি এক অটুট রেকর্ড গড়েন। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার বায়াফ্রান যুদ্ধের মাঝে সান্তোস ক্লাব প্রীতি ম্যাচ খেলতে গেলে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির গল্প প্রচলিত থাকলেও, পেলে নিজে এটি পুরোপুরি সত্য কিনা তা নিশ্চিত নন। ব্রাজিলের সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা পেলের ১০ নম্বর জার্সি ব্রাজিল চিরতরে অবসর দিয়েছে।
দিয়েগো ম্যারাডোনা– ফুটবলের ‘বিদ্রোহী ঈশ্বর’
নিচু সেন্টার অব গ্র্যাভিটির কারণে দিয়েগো ম্যারাডোনার ছিল অকল্পনীয় ব্যালেন্স, যা দিয়ে তিনি একা পুরো রক্ষণভাগ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ী এই তারকা ১৯৮৯ সালে উয়েফা কাপের সেমিফাইনালে ‘Live is Life’ গানের তালে তালে বল নিয়ন্ত্রণের ওয়ার্ম-আপ করে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে হারিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর গোলটিকে ফিফা “শতাব্দীর সেরা গোল” হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইতালির নেপলসে তিনি এমন আইকনে পরিণত হয়েছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পর নেপোলি তাদের স্টেডিয়ামের নামকরণ করে “স্টাদিও দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা”।
লিওনেল মেসি– জাদুর তুলিতে আঁকা পূর্ণতা
লিওনেল মেসি হলেন প্লে-মেকার এবং ফিনিশারের এক নিখুঁত মিশ্রণ, যাঁর বডি ফেক ও ইঞ্চি মেপে পাসের সমকক্ষ কেউ নেই। ছোটবেলায় হরমোনজনিত সমস্যায় তাঁর শারীরিক বিকাশ থেমে গেলে বার্সেলোনাই তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় এবং তাঁর প্রথম চুক্তিটি হয়েছিল একটি রেস্তোরাঁর ন্যাপকিনে। পাঁচটি বিশ্বকাপে খেলা লিওনেল মেসি ২০২২ সালে কাতারে শিরোপা জিতে ক্যারিয়ার পূর্ণ করেন এবং একই সাথে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) ও সর্বোচ্চ গোলদাতার (গোল্ডেন বুট) পুরস্কার জেতেন। আর্জেন্টিনা এবং স্পেনের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা এই জাদুকর বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুটি গোল করেছিলেন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো– পরিশ্রম ও ইচ্ছাশক্তির চূড়ান্ত রূপ
বিদ্যুৎগতি এবং নিখুঁত পায়ের কারুকাজের অধিকারী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ক্যারিয়ারের শুরুতে উইঙ্গার থেকে বিশ্বের সেরা গোলমেশিনে পরিণত হয়েছেন। তিনি টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন এবং ২০১৬ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়ন হন। তাঁর সবচেয়ে উঁচু লাফ ২.৯৩ মিটার রেকর্ড করা হয় ২০১৩ সালে, যা দেখে কোচ ক্লদিও রানিয়েরি তাঁকে এনবিএ বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের সাথে তুলনা করেছিলেন। বিশ্রামে তাঁর হার্টবিট সাধারণ মানুষের অর্ধেকেরও কম থাকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এই মহাতারকা নিজের নামে হোটেল চেইন, মিউজিয়াম ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড পরিচালনা করেন।
ইয়োহান ক্রুইফ– ‘টোটাল ফুটবল’-এর রূপকার
মাঠে জায়গা বের করার অদ্ভুত জ্যামিতিক জ্ঞান এবং ‘ক্রুইফ টার্ন’ দিয়ে ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশলে ইয়োহান ক্রুইফ ছিলেন অনন্য। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে রানার্স-আপ করানো এই কিংবদন্তি স্পন্সরশিপ বিদ্রোহ করে ফাইনালে একটি মাত্র দাগের বিশেষ ডিজাইনের জার্সি পরে খেলেছিলেন। কোচ হিসেবে তিনি বার্সেলোনার ‘ড্রিম টিম’ তৈরি করেছিলেন এবং আধুনিক ফুটবলের দার্শনিক ভিত্তি তথা ‘লা মাসিয়া’ একাডেমির ধারণা মূলত তাঁরই সৃষ্টি। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে ফুটবল তাঁকে অনেক বছর ধূমপানের হাত থেকে বাঁচিয়েছে।
জিনেদিন জিদান– মাঠের বুকে এক চিলতে কবিতা
বল রিসিভ ও ‘রুলেট’ স্কিলে মধ্যমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা জিনেদিন জিদানের খেলা ছিল একটি শিল্পকর্মের মতো। তিনি হেড করে গোল করার জন্য পরিচিত না হলেও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে দুটি গোলই হেড থেকে করে ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করেন। ২০০৬ ফাইনালে ‘পানেনকা’ শটে গোল করার পর মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে গুঁতো দিয়ে লাল কার্ড দেখে ক্যারিয়ারের বিদায় নেন, যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হলেও তিনি এ নিয়ে অনুশোচনা করেননি। পরবর্তীতে কোচ হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদকে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়ে তিনি অনন্য কীর্তি গড়েন।
রোনালদো নাজারিও ‘দ্য ফেনোমেনন’
অমানবিক গতি এবং গোলরক্ষককে একা পেয়ে ড্রিবল করে বোকা বানানোর অদ্ভুত স্টাইল নিয়ে রোনালদো নাজারিও ছিলেন এক ভয়ংকর স্ট্রাইকার। ২০০২ বিশ্বকাপে মিডিয়ার মনোযোগ ইনজুরি থেকে সরাতে তিনি অর্ধেক মাথা কামানো অদ্ভুত হেয়ারকাট নিয়ে মাঠে নামেন এবং আটটি গোল করে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। ১৯৯৮ ফাইনালের আগের রাতে তাঁর রহস্যজনক অসুস্থতার কারণ আজও অজানা রয়ে গেছে। ইনজুরির কারণে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অবসর নেওয়া এই তারকা বর্তমানে ব্রাজিলের ক্রীড়া রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করছেন।
রোনালদিনহো– ফুটবলের চিরন্তন হাসি
রোনালদিনহো ছিলেন ‘জোগা বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের আসল রূপ, যিনি হাসিমুখে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর জাদুকরী ক্ষমতা রাখতেন। ২০০২ বিশ্বকাপ জেতা এই মহাতারকা ২০০৫ সালে বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর প্রতিপক্ষের সমর্থকদের কাছ থেকে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছিলেন। তাঁর নো-লুক পাস দেখে মনে হতো তাঁর মাথার পিছনেও চোখ আছে। পাসপোর্ট জালিয়াতির কারণে ২০২০ সালে জেলে কাটানোর পর তিনি বলেছিলেন যে জীবন তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে।
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার– ফুটবলের ‘ডের কাইজার’
‘লিবেরো’ বা সুইপার পজিশনের উদ্ভাবক ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ডিফেন্ড করে সামনে উঠে আক্রমণে যোগ দেওয়ার এই কৌশল আধুনিক ডিফেন্ডারদের শিখিয়েছেন। ১৯৭০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কাঁধের হাড় ভাঙার পরও তিনি ব্যান্ডেজ বেঁধে ১২০ মিনিট খেলেন, যার কারণে ম্যাচটি ইতিহাসে “শতাব্দীর সেরা ম্যাচ” হিসেবে পরিচিতি পায়। ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তিনি ১৯৭৪ সালে খেলোয়াড় এবং ১৯৯০ সালে কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই মহাতারকা ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
আলফ্রেডো ডি স্টিফানো- ‘সুপার ব্যালন ডি’অর’ বিজয়ী
‘বক্স টু বক্স’ খেলোয়াড় আলফ্রেডো ডি স্টিফানো নিজের ডি-বক্স থেকে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে গিয়ে গোল করতে পারতেন এবং স্ট্যামিনা ও লিডারশিপে অনন্য ছিলেন। তিনটি দেশের হয়ে খেললেও তিনি কখনো বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি এবং ১৯৬৩ সালে ভেনিজুয়েলায় অপহৃত হওয়ার তিন দিন পর অক্ষত অবস্থায় মুক্তি পান। ১৯৫৫-৬০ সালের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদের টানা পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের প্রতিটিতেই তিনি গোল করেছিলেন, যা আজও অটুট রেকর্ড। ১৯৮৯ সালে ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিন তাঁকে ইতিহাসের একমাত্র ‘সুপার ব্যালন ডি’অর’ প্রদান করেছিল।
