সবজিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত ভারী ধাতু, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মানুষ


নোয়াখালী অঞ্চলে উৎপাদিত শাকসবজিতে মিলেছে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ এবং ‘স্যাজ’-এ চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত দুটি গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জেলার সোনাইমুড়ী, সুবর্ণচর এবং সদর উপজেলার মোট ২৭টি সুনির্দিষ্ট স্পট থেকে মাটি, সেচের পানি, ব্যবহৃত সার এবং ফসলের নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় এসব সবজিতে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পাওয়া গেছে, যার মাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

সোনাইমুড়ীর সমন্বিত খামার এবং বিশেষ করে মহাসড়কের পাশের ক্ষেতগুলো থেকে সংগ্রহ করা করলা, ঢ্যাঁড়শ ও মিষ্টি কুমড়াতে সবচেয়ে উচ্চ মাত্রায় সিসা ও আর্সেনিকের উপস্থিতি মিলেছে। অন্যদিকে, সুবর্ণচর উপজেলা থেকে সংগৃহীত মূলা, ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আর সদরের মাইজদী ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার খামারগুলোর বেগুন, বরবটি ও লাউয়ের নমুনায় আশঙ্কাজনক মাত্রায় ক্যাডমিয়াম ও সিসা শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।

গত ২৯ জানুয়ারি ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত প্রথম গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি মূলাতে ক্যাডমিয়ামের সর্বোচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ১৭ মিলিগ্রাম, যা নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি। ক্যানসার ঝুঁকির সূচক অনুযায়ী, এসব সবজি নিয়মিত খেলে প্রতি ১,০০০ জনের মধ্যে ৩ থেকে ৮ জনের ক্যানসার হওয়ার সরাসরি ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য ৭৪ শতাংশই দায়ী এই ক্যাডমিয়াম।

এরপর ১৫ এপ্রিল ‘স্যাজ’ জার্নালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গবেষণাপত্রে নোয়াখালীর সমন্বিত খামারগুলো থেকে সংগৃহীত সবজির ল্যাব টেস্টের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, বাজারে নিয়মিত বিক্রি হওয়া করলা, ঢ্যাঁড়শ এবং মিষ্টি কুমড়াতে উচ্চ মাত্রায় আর্সেনিক, সিসা ও ক্রোমিয়াম জমছে। এর মধ্যে করলাতে সবচেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে। ল্যাব রিপোর্ট বলছে, এসব সবজি খাওয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের শরীরে দৈনিক গড়ে ২.৪১২৮ মিলিগ্রাম সিসা এবং ০.৩৬৪৪ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম প্রবেশ করছে।

এই বিষাক্ত সবজি নিয়মিত খাওয়ার ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ৪৮ গুণ বেশি। যা পুরো জেলার জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ সংকেত।

খাবারে ভারী ধাতুর উপস্থিতির স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রসঙ্গে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের প্রাক্তন অনারারি মেডিকেল অফিসার (এইচএমও) ডা. মজিবুল হক রুবেল জানান, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক এমন এক নীরব ঘাতক যা রান্নার তাপে কোনোভাবেই ধ্বংস হয় না। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষাক্ত সবজি খাওয়ার ফলে মানুষের লিভার ও ফুসফুসের ক্ষতি হতে পারে। রক্তে ইনফেকশন, নারী ও পুরুষের প্রজনন সমস্যা এমনকি বন্ধ্যাত্বের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

দুটি গবেষণাপত্রেই এই মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে সার ও কীটনাশকের অপব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে। ফলন বাড়াতে সোনাইমুড়ীসহ নোয়াখালীর কৃষিতে টিএসপি বা ফসফরাস জাতীয় সার অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সার তৈরির মূল উপাদান ‘ফসফেট রক’ থেকে প্রাকৃতিকভাবেই উচ্চ মাত্রায় ক্যাডমিয়াম মাটিতে মেশে। পাশাপাশি কীটনাশকের স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্যবহৃত সিসা ও আর্সেনিক সরাসরি সবজিকে দূষিত করছে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়কের পাশে থাকা ক্ষেতগুলোতে গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং টায়ারের ক্ষয়প্রাপ্ত কণা বাতাসে মিশে সবজিতে সিসার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সোনাইমুড়ীর নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়ক সংলগ্ন কলাবাগান এলাকার চাষি রেজাউল ইসলাম জানান, মহাসড়কের পাশের ১৬০ শতাংশ জমিতে তিনি চার বছর ধরে সবজি চাষ করছেন। ফসল বাঁচাতে বাধ্য হয়েই তাদের কীটনাশক ও সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে এখন আর চাষাবাদ সম্ভব নয়, ফসল বাঁচাতে কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া উপায় নেই। তবে প্রকৃত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তায় গ্রিনহাউজ পদ্ধতিতে চাষাবাদের বিকল্প প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বিক্রেতাদের পরামর্শে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করার কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন কৃষক। তারা জানান, নির্দেশনা মেনে নির্দিষ্ট সময়ের পর ঢ্যাঁড়শ বা অন্যান্য সবজি তুললে তা আর বিক্রির যোগ্য থাকে না, তাই বাধ্য হয়েই নিয়মের বাইরে গিয়ে দ্রুত ফসল তুলতে হয়।

এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, শাকসবজিতে বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি তিনি আগে শুনলেও নোয়াখালীর উৎপাদিত সবজিতে হেভি মেটাল শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি বলেন, ল্যাবরেটরি সুবিধা উপজেলা পর্যায়ে না থাকায় কীটনাশক-বালাইনাশকের রাসায়নিক গঠন ও মান যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আন্তর্জাতিক জার্নালের এই তথ্যের বিস্তারিত জেনে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি যুক্ত করেন।

স্বাস্থ্য সচেতন মহল মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে সারের মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কৃষকদের জৈব সারের ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি রাস্তার ধারের ফসলি জমিতে সেচ ও বালাইনাশক ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে, না হলে এই উর্বর কৃষিজমিই একদিন স্থায়ী স্বাস্থ্য মহামারির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।