
একটা সাধারণ ডিজিটাল ক্যালকুলেটর কিনুন বাজার থেকে। তারপর চেষ্টা করুন এই সংখ্যাটা টাইপ করতে- ৯৩৮০০০০০০০০০০। পারবেন না। ক্যালকুলেটরের ছোট্ট পর্দায় এই সংখ্যা ধরে না। অথচ এটাই বাংলাদেশের আগামী এক বছরের বাজেট। তেরোটি সংখ্যা দিয়ে লেখা, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল অঙ্ক।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে উঠে দাঁড়ালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের এই প্রথম বাজেটের শিরোনাম দিয়েছেন তিনি, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। খটোমটো নাম, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে কোটি মানুষের জীবনের হিসাব-নিকাশ।
এত টাকা আসলে কতটা টাকা?
সংখ্যাটা মাথায় ঢুকছে না? স্বাভাবিক। তাহলে একটু অন্যভাবে ভাবুন।
এই টাকা দিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মতো কুড়িটি বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফেলা সম্ভব। অলিম্পিকের মতো ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বসানো যাবে সাত থেকে আটটি। ব্যাংক থেকে এই টাকা তুলুন এক হাজার টাকার নোটে, পাবেন ৯৩৮ কোটি ব্যাংক নোট। সব নোট একটার ওপর একটা সাজালে সেই স্তূপ উঠে যাবে ৯৩৮ কিলোমিটার উপরে- ছাড়িয়ে যাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আইএসএসকে, এবং সেটাও দুইবার।
আর নোটগুলো যদি পাশাপাশি বিছিয়ে দেন? তাহলে সেই সারি চলে যাবে দেড় কোটি কিলোমিটার দূরে। পৃথিবী থেকে চাঁদে চারবার যাওয়া-আসা করা যাবে সেই টাকার পথ ধরে।
সব নোটের ওজন হবে ৯ হাজার ৩৮০ মেট্রিকটন- দেড় হাজার আফ্রিকান হাতির ওজনের সমান। আইফেল টাওয়ারের ওজনের কাছাকাছি।
আপনার মাসিক আয় যদি ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে এই পুরো বাজেটের সমান টাকা কামাতে আপনার লাগবে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৩৩ হাজার বছর। পৃথিবীর বয়স সাড়ে চারশো কোটি বছর, তার মধ্যে এই সময়টুকু নিতান্তই সামান্য নয়।
পৌনে এক হাজার কোটি থেকে ট্রিলিয়নের পথে
১৯৭২ সালের ৩০ জুন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন দেশের প্রথম বাজেট, মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার।
ঠিক ৫০ বছর পর, ২০২২ সালে বাংলাদেশ উদ্বোধন করল পদ্মা সেতু। শুধু ওই একটি সেতু বানাতেই খরচ হলো ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি, বাহাত্তর সালের আটত্রিশটি বাজেটের সমান।
ওই পৌনে এক হাজার কোটির বাজেট বাড়তে বাড়তে প্রথমবার ১ ট্রিলিয়ন ছোঁয় ২০০৯ সালে। আবুল মাল আব্দুল মুহিত সেবার বাজেটের নাম দিয়েছিলেন ‘দিন বদলের বাজেট’। দেড় দশকে দিন কতটা বদলেছিল সেই বিচার জনগণের, কিন্তু বাজেটের আকার বদলেছিল দ্রুতগতিতে। আওয়ামী লীগের শেষ বাজেটে সেটা পৌঁছায় ৬ লাখ ৩১ হাজার কোটিতে। তারপর অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বাজেট দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটিতে।
আর এবার? তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে এক লাফে দেড় লাখ কোটি টাকার বৃদ্ধি। রেকর্ড ব্রেকিং।
আপনার ভাগে কত পড়ল?
পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এই মুহূর্তে ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার। সেই হিসাবে বাজেটের এই বিশাল পাহাড় থেকে আপনার ভাগে পড়ছে ৫৪ হাজার ৫৭ টাকা ১৭ পয়সা।
এই ৫৪ হাজার টাকার ভেতর থেকে কোথায় কত যাচ্ছে, সেটা জানলে চমকে উঠতে পারেন।
সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ১৮ হাজার টাকা, চলে যাচ্ছে উন্নয়ন বা এডিপি খাতে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় যাচ্ছে ৫ হাজার ১৫০ টাকার বেশি। আর সবচেয়ে গলার কাঁটা হলো, ৭ হাজার ৩০০ টাকা চলে যাচ্ছে শুধু পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে। মানে আগের সরকারগুলোর ধার শোধ করতে।
মোট সুদ বাবদ ব্যয় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, গোটা বাজেটের সাড়ে ১৩ শতাংশ। প্রতি সাত টাকা ব্যয়ের বিপরীতে এক টাকা যাচ্ছে কেবল সুদ পরিশোধে। এই টাকায় চারটি পদ্মা সেতু বানানো যেত, চারটি মেট্রোরেলও।
অর্থমন্ত্রী ঋণনির্ভরতা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এই বাজেটেই ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি মেটাতে হবে দেশ-বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে। অর্থাৎ আগামী বছর আপনার মাথায় নতুন করে চাপবে আরও ১৪ হাজার টাকার ঋণের বোঝা। এর আগে কোনো বাজেটে এত বড় মাথাপিছু ঋণের ভার ছিল না।
ভাবছেন এড়িয়ে যাবেন? উপায় নেই। আপনার উপার্জনের প্রতিটি টাকায়, কেনা প্রতিটি পণ্যে ট্যাক্স বসিয়ে সরকার তার পাওনা বুঝে নেবেই। আগামী বছর আপনার কাছ থেকে গড়ে ৪০ হাজার টাকা কর ও ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
যা সস্তা হবে, যা দামি হবে
বাজেটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে আপনার রান্নাঘর ও বাজারের থলেতে।
সুখবর হলো, ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে করের হার কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গের মতো মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। খেজুরেও একই সুবিধা। ক্যানসারসহ নানা রোগের ওষুধের কাঁচামালে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিডনি রোগীর প্রতিবার ডায়ালাইসিসে খরচ কমতে পারে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য বড় খবর- ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সোনার গয়নায় ভ্যাট কমে এখন ভরিপ্রতি মাত্র আড়াই হাজার টাকা।
তবে কিছু জিনিসের দাম বাড়বে। সিগারেট মহার্ঘ হবে। তেলচালিত মাঝারি গাড়িতে কর বাড়ছে। বিদেশি কাজুবাদাম, পাঙাশের ফিলে, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, খেলনা- এসবের দামও বাড়তে পারে।
স্বপ্নের ফিরিস্তি
এই বাজেটে সরকার স্বপ্ন দেখিয়েছে বড়। ১০টি অগ্রাধিকার খাত ঠিক করা হয়েছে- উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশসহ আরও অনেক কিছু।
আগামী দুই বছরে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে ফাইভজি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। আইসিটি খাতে জিডিপিতে অবদান ১-২ শতাংশ থেকে পাঁচ বছরে ১০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীরা পাচ্ছেন বহুল প্রতীক্ষিত নবম বেতন কাঠামো- ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে। সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ রয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কর্ডলাইন নির্মাণ হলে দূরত্ব কমবে ৮০ কিলোমিটার। সব জেলায় রেল নেটওয়ার্ক, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন, উচ্চগতির রেলের দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নও আছে বাজেটে। সরকার বিশ্বাস করে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি।
স্বপ্ন বড়, চ্যালেঞ্জও কম নয়। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তারপর দেখা যাবে, আপনার ভাগের ৫৪ হাজার টাকার এই হিসাব আসলে আপনার জীবনে কতটা পরিবর্তন আনে। বাজারে গিয়ে পেঁয়াজের দাম কমে কিনা, বিদ্যুৎ বিল কমে কিনা, রাস্তায় একটু বেশি মেট্রো চলে কিনা।
কারণ শেষ পর্যন্ত, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটের সাফল্য মাপা হয় একজন সাধারণ মানুষের মাসের শেষে হাতে কতটা টাকা থাকল- সেই ছোট্ট হিসাবে।
